

আল্লাহ বলেন, আমি তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকিবার ও বেশভুষার জন্য পরিচ্ছদ দিয়াছি (৭ঃ২৬)। যে পোশাকটি দৃঢ় বা মজবুত তাহাই উত্তম পোশাক (৭ঃ২৬)। এই আয়াতে তাকৌউ শব্দ এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে দৃঢ় বা মজবুত (আরবি অভিধান পৃ. নং- ৮৯৭)। অর্থাৎ যে পোশাক শক্ত ও মজবুত যাহা পরিধান করিলে শত্র“সৈন্য আক্রমন করার সময় লজ্জাস্থান আলগা না হয় অর্থাৎ যুদ্ধক্ষেত্রে যে পোশাক সৈনিকরা পরিধান করে, লজ্জাস্থান ঢাকিবার জন্য সেইটাই উত্তম পোষাক। আর সেই পোশাকটা হচ্ছে প্যান্ট এবং শার্ট। কারণ প্যান্ট এবং শার্টই হচ্ছে শক্ত ও মজবুত পোষাক। আর উক্ত আয়াত অনুসারে আল্লাহর পছন্দনীয় পোষাক হচ্ছে প্যান্ট এবং শার্ট। তবে নিজের পোষাক উত্তমভাবে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যাতে সেটা পবিত্র থাকে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরিচ্ছদকে পবিত্র রাখ’ (৭৪ঃ৪)। আর পোশাক আমাদেরকে তাপ (তথা পরিবেশের প্রতিকূল আবহাওয়া) থেকে রক্ষা করে (১৬ঃ৮১)। অতএব যে পোশাক শীত তাপ থেকে সঠিকভাবে নিজেকে রক্ষা করতে পারে সেটাই উত্তম পোষাক। আর সেদিক থেকেও প্যান্ট শার্টই উত্তম। পবিত্র কুরআন অনুসন্ধান করে দেখা গেল লম্বা লেবাস, টুপি ও পাগড়ী ইসলামী পোষাক কিংবা ঐ পোষাকগুলি ইবলিশে ধারণ করতে পারে না এই মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীরা লম্বা লেবাস, টুপি ও পাগড়ী ধারণ করতে সক্ষম। কারণ কারবালার প্রান্তরে ইমাম হাসান (রাঃ) এবং তাঁর পরিবার পরিজনকে যারা হত্যা করেছিল তাদের পোষাকও এইগুলিই ছিল। কারণ এই লেবাসগুলি আরব দেশের কাফেররাও পরিধান করিত। কাজেই এইগুলি আরবদেশীয় পোষাক, কিন্তু ইসলামী পোষাক নয়, এটা নিশ্চিত। এখানে উল্লেখ্য যে, লম্বা লেবাস, টুপি ও পাগড়ী সালাতের সময় ব্যবহার করতে হবে এমনও আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। আর ছালাতের সময় তোমার পরিচ্ছদ সুন্দর রাখিবে (৭ঃ৩১)। অতএব, এই আয়াত অনুসারে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন ভাবে যে কোন সুন্দর পোষাক পরিধান করে সালাত আদায় করা যাবে। লম্বা লেবাস, টুপি ও পাগড়ী ইসলামী পোষাক এই কথার কোন ভিত্তি নেই। তারপরও অধিকাংশ লোকের ধারণা লম্বা লেবাস, টুপি ও পাগড়ী ইসলামী পোষাক এই কথা কোরআনে না থাকার পরও যদি কেহ অধিকাংশ লোকের কথা মতো এইগুলিকে ইসলামী পোষাক মনে করে, তাদের জন্য বলতে হয় যারা অধিকাংশ লোকের কথামত চলে সে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হবে (৬ঃ১১৬)। কারণ সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আল্লাহর কথাই পরিপূর্ণ (৬ঃ১১৫)।
তোমরা সালাতের সময় হলে আযান দিবে এমন আয়াত পবিত্র কোরআনে নেই। তবে আয়াত এসেছে, তোমরা মানুষের নিকট হজ্বের ঘোষণা দাও (২২ঃ২৭)। এই আয়াতে আযান শব্দ হয়েছে। আযান শব্দের আভিধানিক হচ্ছে ঘোষণা করা বা জ্ঞাত করা (আরবি অভিধান পৃ. নং-১৩০)। তাছাড়া আল্লাহ আরো বলেন, হজ্বের দিবসে আল্লাহ ও রসূলের পক্ষ থেকে ঘোষণা (৯ঃ৩)। এই আয়াতে আযান শব্দ এসেছে। কিন্তু পবিত্র কোরআনের সালাতের জন্য যে সমস্ত আয়াত এসেছে, সে সমস্ত আয়াতে সালাতের জন্য ঘোষণা কর এমন আয়াত আসে নাই। কিংবা সালাতের সময় আযান দাও, এই মর্মেও কোন আয়াত আসে নাই। তাছাড়া ৫ ওয়াক্ত সালাত কায়েম কর মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে আসে নাই, বিধায় ৫ ওয়াক্ত সালাতের সময় মসজিদে আযান দিতে হবে এই মর্মেও কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে আসে নাই। তবে আয়াতে এসেছে, ‘তোমরা সালাত কায়েম কর’ (২৪ঃ৫৬)। আর সালাত বলতে সেজদাকেই বুঝায় (৪ঃ১০২) আর সেই সেজদাই সালাত, যে সেজদা ইবলিশ করে নাই। আর সেটা হচ্ছে আদম কাবায় সেজদা। কারণ ইবলিশ আদম কাবায় না দিয়েই কাফের (২ঃ৩৪)। আর যখন কোন মানুষ আদম কাবায় সেজদা করে, তখন তার দেহ মন থেকে ইবলিশ দূরীভূত হয়। কারণ ইবলিশ কখনও আদম সেজদার শামিল হবে না (১৫ঃ৩৩)। আর যে কাজ করলে ইবলিশ দূরীভুত হয় সে কাজটিই সালাত (২৯ঃ৪৫)। আর আদম কাবায় সেজদা সিরাতুল মুস্তাকিম (১৫ঃ৪১)। ইবলিশ সব সময়ই এই সিরাতুল মুস্তাকিমেই ওত পাতিয়া বসিয়া থাকে (৭ঃ১৬)। আর ইবলিশতো মানুষকে এই সেজদা থেকে বিরত রাখে (২৭ঃ২৫) আর এই সেজদার দিকে মানুষকে ডাকাই সালাতের দিকে ডাকা। আর মানুষকে যখন এই (আদম কাবায়) সেজদার দিকে তথা সালাতের দিকে ডাকা হয় তখন ইবলিশের অনুসারীরা হাসি তামাশা করে (৫ঃ৫৮)। সম্মেলনের দিনে যখন তোমাদের সালাতের জন্য ডাকা হয় (৬২ঃ৯) এই আয়াতে ‘নিদাউ’ শব্দ এসেছে যার অর্থ হচ্ছে ডাকা বা সম্ভোধন করা (আরবি অভিধান পৃ. ২৩৮৯)। এখানে উল্লেখ্য যে, আযান এবং ‘নিদাউ’ উভয়ই আরবী শব্দ। হজ্বের ক্ষেত্রে আযান শব্দ এসেছে আর সালাতের ক্ষেত্রে ‘নিদাউ’ শব্দ এসেছে। এখানে দুইটি আয়াত দুইটি শব্দ। দুইটি আয়াতের উদ্ধেশ্যও ২টি। এখন যদি কেহ ‘নিদাউ’ শব্দ দিয়ে আযান অর্থ করে সেক্ষেত্রে ‘নিদাউ’ শব্দের আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। আর আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা যাবে না (২২ঃ৫১)। কাজেই ‘নিদাউ’ শব্দকে আযান অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। এই আয়াতে ‘নিদাউ’ শব্দ দিয়ে গুরুর কাবায় তথা রসূল কাবায় সেজদার দিকে মানুষকে ডাকার কথা বলা হয়েছে, এইজন্য এখানে আযান শব্দ না এসে ‘নিদাউ’ শব্দ এসেছে। এই মর্মে সালাতের বিষয় ঘোষণা করতে বলা হয় নাই। কারণ আয়াতে আযান শব্দ আসে নাই। এখানে উল্লেখ্য যে, সূর্য হেলে পড়ার পর হতে রাত্রির ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করার নির্দ্ধারিত সময় (১৭ঃ৭৮)। অর্থাৎ দিনের শেষাংশ এবং রাত্রের প্রথমাংশ সালাত কায়েম করার নির্দ্ধারিত সময় (১১ঃ১১৪)। আল্লাহ বলেন তোমরা এই নির্দ্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা তোমাদের জন্য অবশ্য করণীয় কাজ (৪ঃ১০৩)। তাহলে দেখা গেল নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করার আয়াত পাওয়া গেল। কিন্তু সালাতের জন্য নির্ধারিত সময়ে তোমরা আযান দাও এই মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কোরআনে নাই। অতএব আযান শুনে মসজিদে যাওয়া জরুরী নহে। প্রয়োজনে বাসগৃহেই সালাত আদায় করা যাবে (১০ঃ৮৭)। এতে প্রমাণিত হয় যে, দিনে পাঁচবার মসযিদে আযান দেওয়া জরুরী নহে। তবে সালাত কায়েম করা ফরজ, কিন্তু সালাতের সময় আযান দেওয়া ফরজ নহে। এখন যদি কেহ বলে অধিকাংশ লোকইত সালাতের পূর্বে আজান দেওয়া ফরজ মনে করে, তাদের জন্য বলতে হয়, যদি কেহ অধিকাংশ লোকের কথা মতো চলে সে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হবে (৬ঃ১১৬)। কারণ সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আল্লাহর কথাই পরিপূর্ণ (৬ঃ১১৫)।
পবিত্র কোরআনের কোথাও জামাতের সাথে সালাত আদায় করার কথা উল্লেখ নাই। অনেকেই সূরা বাকারার ৪৩ নং আযাত দিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করার বিষয়টি প্রমাণ করতে চায়। কিন্তু না, এই আয়াতে জামাতের সাথে সালাত কায়েম করার বিষযটি প্রমাণ হয় না। কারণ আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা সালাত কায়েম কর এবং যাকাত দাও এবং মাথা নতকারীর সাথে মাথা নত কর (২ঃ৪৩)। এই আয়াতে রাকা’আ শব্দ এসেছে যার অর্থ হচ্ছে মাথা নত করা (আরবী অভিঃ পৃঃ ১৩৭৫)। আর এই আয়াতে মাথা নত করার বিষয়টি সালাতের সাথে সম্পর্কযুক্ত নহে। কারণ সালাত একটা বিষয়, আর মাথা নত আর একটা বিষয়। কারণ আয়াতে বলা হয়েছে, তোমরা সালাত কায়েম কর এবং রুকু কর। তাহলে সালাত কায়েম করা আর মাথা নত করা আলাদা বিষয়। কারণ আয়াতে সালাত কায়েম কর এবং যাকাত আদায় কর এবং রুকু বা মাথা নত কর। এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে বুঝানোর জন্যই ‘এবং’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, সালাত ও রুকু এক বিষয় নহে, কিংবা রুকু সালাতের অংশ নহে। আর এই আয়াতে মাথা নত কারীর সাথে গিয়ে মাথা নত করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ মাথানতকারী বলতে তাদেরকেই বুঝানো হয়েছে, যারা রসূলের কাছে গিয়ে তার কাছে মাথা নত করেছে। সে ক্ষেত্রে আবু জেহেল রসূলের কাছে মাথা নত করে নাই। আর হযরত আলী কিংবা অন্যান্য সাহাবারা রসূলের কাছে গিয়ে মাথা নত করেছে। আর এই আয়াতে তাই বলা হয়েছে, তোমরা মাথানতকারীর সাথে গিয়ে রসূলের কাছে মাথা নত কর। অতএব মাথা নত করার বিষয়টি সালাতের অংশ নহে। কাজেই যারা উক্ত আয়াতে মাথা নত করার বিষয়টা সালাতের সাথে যুক্ত করে জামাতের সাথে সালাত কায়েম করা প্রমাণ করে তাহলে উক্ত আয়াতে মাথা নত করার বিষয়টি ব্যর্থ হবে। আর আয়াতের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (২২ঃ৫১)। যারা আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে মূলত তারা মূর্খ বা অজ্ঞ। আর আল্লাহ বলেন তোমরা অজ্ঞ ব্যক্তিদের (বুঝ)কে পরিহার কর (৭ঃ১৯৯)। কাজেই জামাতের সাথে সালাত কায়েম করা কথা যেহেতু পবিত্র কোরআনে নাই, সেক্ষেত্রে বাসগৃহে সালাত আদায় করতে নিষেধ নাই। এই মর্মে আল্লাহ বলেন প্রয়োজনে তোমরা বাসগৃহে সালাত আদায় কর (১০ঃ৮৭)। এখন যদি কেহ বলে অধিকাংশ লোকইত জামাতের সাথে সালাত আদায় করা উত্তম মনে করে, তাদের জন্য বলতে হয়, যদি কেহ অধিকাংশ লোকের কথা মতো চলে সে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত হবে (৬ঃ১১৬)। কারণ সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আল্লাহর কথাই পরিপূর্ণ (৬ঃ১১৫)। যেহেতু দ্বীনের ক্ষেত্রে কোরআর পরিপূর্ণ দলিল (৫ঃ৩) অতএব, দ্বীনের বিষয়ে যারা কোরআন মাফিক বিধান দেয় না তারা যালিম, ফাসিক ও কাফির (৫ঃ৪৪, ৪৫, ৪৭)।
পবিত্র কোরআনে অনুসন্ধান করে দেখা গেল ঈদুল ফিতর এর সালাত কায়েম করা, ঈদুল আযহা’র সালাত কায়েম করা, এবং তারাবিহ সালাত কায়েম করা, এবং সবে বরাতের সালাত কায়েম কর এইগুলি কোনটাই পবিত্র কোরআনে উল্লেখ নেই। বিধায় এইগুলি দ্বীনের মধ্যে অতিরিক্ত বিষয়, এইগুলো ফরজ নয়। তবে যদি কেহ এই সময়ে সালাত আদায় করে এতে কোন দোষ নেই।
আল্লাহ বলেন, তোমরা অনুসরণ কর তাদের যারা কোন বিনিময় নেয় না, অথচ তারা সত্য পথে আছে (৩৬ঃ২১)। অতএব মসযিদের ঈমাম যখন বেতনভুক্ত তখন তাকে অনুসরণ করা কোরআন সম্মত নয়। আর কিছু লোক এমন আছে দ্বীন প্রচার করার দায়িত্ব প্রাপ্ত না হওয়া সত্ত্বেও তারা দ্বীন প্রচার করতে যায়। আর সেক্ষেত্রে পবিত্র কোরআনের বিশেষ বিশেষ আয়াত বা অংশ গোপন রাখে যেমন আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদার কথা কোরআনে উল্লেখ থাকার পরও ঐ সেজদার রহস্য ব্যক্ত করে না। উহারা সত্য গোপন করে বিনিময় কিছু পারিশ্রমিক গ্রহণ করে, তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, যারা আমার আয়াতকে গোপন করে তাদেরকে আমি লানত করি (২ঃ১৫৯)। আর আয়াত গোপন করার শর্তে তাহারা কিছু বিনিময় নিয়ে মনগড়া কিচ্ছা কাহিনী বলে ওয়াজ করে টাকা চুক্তির মাধ্যমে, তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, যারা আমার আয়াত গোপন করে বিনিময় নেয় তাদের নিজেদের জঠরে অগ্নি ব্যতিত কিছুই পুরে না (২ঃ১৭৪)। আর কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদের সাথে কথা বলবেন না (২ঃ১৭৪)। আর তাদেরকে আল্লাহ কখনও পবিত্র করবেন না এবং তাদের জন্য কঠিন শাস্তি রয়েছে (২ঃ১৭৪) আর উহারাই সৎ পথ হতে ভ্রান্ত পথে আছে (২ঃ১৭৫) এবং উহারা ক্ষমার পরিবর্তে শাস্তি ক্রয় করিয়াছে আর আগুন সহ্য করিতে তাহারা কতইনা ধৈর্য্যশীল (২ঃ১৭৫)। কাজেই যারা চুক্তি ভিত্তিক ওয়াজ করা নামধারী আলেম, যাহারা এহেন বিনিময় গ্রহণ করে উহারা যেহেতু ভ্রান্ত পথে আছে, আর তাদের মতবাদও ভ্রান্ত মতবাদ, আর তাদের বিষয়ে এত আজাব গজবের কথা কোরআনে উল্লেখ করার পরও উহারা জেনে শুনেই সেগুলি করে ফলে তাহারা মুর্খ। আর মূর্খদেরকে পরিহার কর (৭ঃ১৯৯) তাদের মতবাদও পরিহারযোগ্য।
আল্লাহ বলেন, যারা মসজিদ নির্মাণ করিয়াছে (রসূলের বিনা অনুমতিতে) ক্ষতি সাধনের উদ্দেশ্যে, কাফেরী কার্যক্রম পরিচালনা করার উদ্দেশ্যে, মমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে এবং আল্লাহ ও রসূলের বিরোধিতার উদ্দেশ্যে সে সমস্ত মসজিদে তুমি সালাতের জন্য দাড়াইওনা (৯ঃ১০৭) (৯ঃ১০৮)। এই আয়াতে ধীর্ররা শব্দ এসেছে। যার অর্থ হচ্ছে ক্ষতিসাধন করা। (আরবী অভিঃ পৃ. ১৬৩৩)। কাজেই এক শ্রেণীর মসজিদ আছে, যে মসজিদগুলি মোমিনদের ক্ষতির উদ্দেশ্যে তৈরী। তাহলে সাধারণ মানুষের জন্য এটা চিনবার উপায় কী? এ বিষয়টি অনেকেরই অজানা। আর এইজন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের কাছে রসূল পাঠিয়েছি, যে তোমাদেরকে অজানা বিষয় শিক্ষা দিবে (২ঃ১৫১)। আর যে সকল মসজিদগুলি রসূলের অনুপস্থিতিতে রসুলের বিনা অনুমতিতে ইবলিশের অনুসারীদের দ্বারা তৈরী এবং ইবলিশের অনুসারীদের দ্বারা পরিচালিত সেই মসজিদগুলি মোমিনদের জন্য নিরাপদ নহে। কারণ সেই মসজিদগুলিতে এক শ্রেণীর কিতাবীরা উৎ পাতিয়া বসিয়া থাকে ঈমানের ক্ষতি সাধনের জন্য। মূলতঃ উহারা ছিল ইবলিশের অনুসারী। কোন মোমিন যদি সেই সকল মসজিদে নিয়মিত আগমন করে তাহলে উহারা তাকে কাফের বানাইয়া দিবে। এই জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা কিতাবীদের দলবিশেষের আনুগত্য করিও না উহারা তোমাকে কাফের বানাইয়া দিবে (৩ঃ১০০)। কারণ ঐসকল কিতাবীরাতো ইবলিশের অনুসারী। আর ইবলিশের অনুসারী তারাই যারা গুরু তথা রসূলের কাছে আনুগত্যের বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে আদম কাবায় সেজদা করে নাই। আর ইবলিশতো আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (২ঃ৩৪)। আর এইজন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা ইবলিশের অনুসরণ করিও না (আদম কাবায়) সেজদা কর এবং আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও (সূরা আলাক-১৯)। কাজেই যে সকল মসজিদগুলি ইবলিশের অনুসারী দ্বারা পরিচালিত রসুলের বিনা অনুমতিতে তৈরি সেই সকল মসজিদ সালাতের জন্য উপযোগী নহে।
অনেকেই বলে, নবী (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণে রসূলের সুন্না তথা হাদীসকে দীনের দলিল হিসাবে রেখে গেছেন। তাদের এই কথা ঠিক নহে। কারণ নবী (সঃ) দ্বীনের ক্ষেত্রে একটি কথাও নিজের তরফ থেকে বা মনগড়াভাবে বলেন নাই (৫৩ঃ৩)। তাঁহার প্রতি যাহা ওহী নাযিল হইত দ্বীনের ক্ষেত্রে তিনি শুধু তাহাই ব্যক্ত করেন (৫৩ঃ৪)। তিনি কোন কিছু আল্লাহর নামে বানাইয়া বলেন নাই (৬৯ঃ৪৪)। যদি আল্লাহর নামে কোন কিছু বানাইয়া বলিতেন তাহলে আল্লাহ তার দক্ষিণ হস্ত ধরিয়া ফেলিতেন (৬৯ঃ৪৫) এবং তাঁর জীবন ধমনী কাটিয়া দিতেন (৬৯ঃ৪৬)। তাছাড়া তিনি ওহী ব্যতিত দ্বীনের ক্ষেত্রে কাউকে সতর্ক করেন নাই (২১ঃ৪৫)। আর নবী (সঃ) ওহী ব্যতিত কোনকিছু অনুসরণও করেন নাই (৬ঃ৫০) আর আল্লাহ তো নবী (সা.)-এর জন্য এই কোরানকে বিধান হিসেবে নির্দিষ্ট করেছেন (২৮ঃ৮৫)। আর নবী (সঃ)-কে আল্লাহ বলেন, তুমি ওহিকে অবলম্বন কর (৪৩ঃ৪৩) আর তিনি তো প্রভুর স্পষ্ট প্রমাণের উপর অর্থাৎ ওহীর উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল (৬ঃ৫৭)। কারণ দ্বীনের বিষয়ে কোরআনই পরিপূর্ণ দলিল (৫ঃ৩)। কারণ সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে আল্লাহর কথাই পরিপূর্ণ (৬ঃ১১৫)। অতএব, দ্বীনের বিষয়ে যারা কোরআন মাফিক বিধান দেয় না তারা যালিম, ফাসিক ও কাফির (৫ঃ৪৪, ৪৫, ৪৭)। কাজেই নবী (সঃ) কোরআনের বাইরে হাদীসকে বা সুন্নাকে দ্বীনের বিষয়ে দলিল হিসাবে রেখে গেছেন এই কথার কোন ভিত্তি নেই। তবে এক শ্রেণীর লোক নবী (সঃ) বিদায় হজ্বের ভাষণকে বিকৃতভাবে বর্ণনা করেছে। বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী (সঃ) সেই দুইটি বিষয়ের কথাই উল্লেখ করে বলেছেন, যে দুইটি বিষয় সূরা মায়েদার ৪৮ নং আয়াতের মাধ্যমে আল্লাহ তাকে জানাইয়া দিয়াছেন। লিবুল্লী যাআলনা মিনকুম শির আতা ওয়া মিনহাজা। এখানে উল্লেখ্য যে, শির আতা অর্থ ধর্মীয় আইন (আরবী অভি. পৃ. নং-১৫২০)। মিনহাজার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে প্রকাশ্য রাস্তা (আরবী অভি. পৃ. নং- ২৩১২)। উক্ত আয়াতের অর্থ হচ্ছেÑ প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি ধর্মীয় আইন (কুরআন) এবং (আল্লাহ প্রাপ্তির) প্রকাশ্য রাস্তা। অর্থাৎ এই দুইটি বিষয় হচ্ছে (১) আল্লাহর বিধান যেটা কিতাবউল্লাহ, অর্থাৎ এই কোরআন। (২) অপরটি হচ্ছে মিনহাজা। অর্থাৎ আল্লাহ প্রাপ্তির প্রকাশ্য পথ। যে পথের মধ্যে ডযড় রং ঃযব অষষধয এর অহংবিৎ নিহিত আছে। যে পথটা বর্তমান তথ্য ও প্রযুক্তি বিজ্ঞান ভিত্তিক দর্শনের যুগেও মানুষের কাছে অজানা। আর আল্লাহ বলেন, অজানা বিষয়টি রসূল তোমাদেরকে শিক্ষা দিবেন (২ঃ১৫১)। এই জন্য মোমিনদের মধ্য থেকেই মোমিনদের কাছে রসূল পাঠাই (৩ঃ১৬৪)। এইজন্য প্রত্যেক নবীর কাছথেকে এই মর্মে অঙ্গীর নিয়েছেন তোমার (শেষাংশে) কাছে একজন রসূল যাবে, তাকে তুমি রিশ্বাস করবে এবং (রিসালাত দিয়ে) সাহায্য করবে (৩ঃ৮১)। এই অঙ্গিকার অনুসারে প্রত্যেক নবীর শেষাংশে বিশ্বস্তদের মধ্যথেকে একজনকে রেসালাতের ভার দিয়ে রসূল হিসাবে রেখে গেছেন। যার মধ্যে আল্লাহ প্রাপ্তির প্রকাশ্য পথ নিহিত আছে। অতএব বিদায় হজের ভাষণে নবী (সা.) দুটি বিষয় রেখে গেছেন (১) কিতাবুল্লাহ অর্থাৎ কোরান (২) রসুল যেটা আল্লাহ প্রাপ্তির স্পষ্ট পথ যেটা মিনহাযা বলে উল্লেখ করা হযেছে। অতএব বিদায় হজ্বের ভাষণে নবী (সঃ) কোরআনের বাইরে হাদীসকে বা সুন্নাকে দ্বীনের বিষয়ে দলিল হিসাবে রেখে গেছেন এই কথার কোন ভিত্তি নেই।
আমরা হয়ত অনেকেই মনে করি যে, সালাত আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহর ইবাদত করি। সালাত আদায় করা আল্লাহর হুকুম! এটা আদায় করা ফরজ, কিন্তু সালাত আদায় করা আল্লাহর ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে না। কারণ সালাত এবং ইবাদত এক বিষয় নয়। এইমর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাহর ইবাদতে একনিষ্ট হও এবং সালাতে একনিষ্ট হও এবং যাকাত আদায় কর (৯৮ঃ৫)। এই আয়াতে ইবাদত করার পরেও সালাতে একনিষ্ট হও। এতে প্রমাণিত হয় যে, সালাত ইবাদতের অংশ নহে। আবার অনেকেই আল্লাহকে সেজদা করাকে ইবাদত বলে মনে করে। কিন্তু না, ইবাদত এবং সেজদা এক বিষয় নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মানুষ তোমরা আল্লাহকে সেজদা কর এবং তার ইবাদত কর (৫৩ঃ৬২)। হে মোমিনগণ তোমরা আল্লাহকে সেজদা কর এবং তার ইবাদত কর (২২ঃ৭৭)। কাজেই সেজদা করা ইবাদতের অংশ নহে। অনেকেই মনে করে রুকু করা বা মাথা নত করা হয়ত ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু না, আল্লাহর ইবাদত এবং রুকু এক বিষয় নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মোমিনগণ তোমরা রুকু কর এবং প্রভুর ইবাদত কর (২২ঃ৭৭)। কাজেই রুকু করা ইবাদতের অংশ নহে। অনেকেই মনে করে সৎ কর্ম করা হয়ত ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু না, সৎ কর্ম আর ইবাদত এক বিষয় নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মোমিনগণ তোমরা প্রভুর ইবাদত কর এবং সৎ কর্ম কর (২২ঃ৭৭)। অনেকেই মনে করে যে, যাকাত দেওয়া হয়ত ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু না, ইবাদত এবং যাকাত এক বিষয় নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে মোমিনগণ তোমরা প্রভুর ইবাদত কর এবং যাকাত আদায় কর (৯৮ঃ৫)। অনেকেই মনে করে আল্লাহকে ভয় করা হয়ত ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু না, আল্লাহকে ভয় করা এবং ইবাদত এক বিষয় নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং আল্লাহকে ভয় কর (৭১ঃ৩)। অনেকেই মনে করে রসূলের আনুগত্য করা হয়ত ইবাদতের পর্যায়ে পড়ে। কিন্তু না, রসূলের আনুগত্য এবং আল্লাহর ইবাদত করা এক বিষয় নয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং রসূলের আনুগত্য কর (৭১ঃ৩)। এতে প্রমাণ হয় রসূলের আনুগত্য করা ইবাদতের অংশ নহে। এখানে উল্লেখ্য যে, دباع ’আবদ’ শব্দ থেকে ইবাদত। আর আবদ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে ক্রীতদাস বা গোলাম (আরবী অভিঃ পৃ. ৩৫৭)। তাহলে ইবাদত বলতে দাসত্ব করা বুঝায়। গোলাম যখন তার মালিকের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। তার পরে তার মালিক যাহা ইচ্ছা করে তাহাই গোলামের ইচ্ছা। অর্থাৎ গোলামের নিজস্ব কোন ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা থাকে না। অর্থাৎ তার সকল ইচ্ছাশক্তিকে মালিকের কাছে বিক্রি করার মাধ্যমে সে মালিকের ক্রীতদাস হয়ে গেছে। আর তাই যদি কেহ আল্লাহর কৃতদাস হতে ইচ্ছা করে, তাহলে তার ইচ্ছাশক্তিকে আল্লাহর কাছে বিক্রয় করতে হবে। তা না করে আমরা আমাদের ইচ্ছাশক্তিকে নিজের অধীনে রেখে মুখে বলছি, আমরা আল্লাহর দাস। কিন্তু না, মূলতঃ আমরা আমিত্বের শৃংখলে আবদ্ধ আছি। আমিত্বের শৃংখল থেকে মুক্ত হতে হলে নিজের ইচ্ছাশক্তি তথা আমিত্বকে প্রভুর কাছে বিক্রয় করতে হবে। আর প্রভুর কাছে আমিত্বকে বিক্রয় করতে গেলে অবশ্যই একজন ক্রেতার প্রয়োজন। আর সেই ক্রেতাই হচ্ছে আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে স্বয়ং রসূল। আর আদম রসূলতো আল্লাহর প্রতিনিধি (২ঃ৩০)। যখন কোন মানুষ নিজের ইচ্ছাশক্তিকে রসূলের কাছে বিক্রয় করে বায়াতের মাধ্যমে তখন সেতো আল্লাহর কাছেই বিক্রি হইল (৪৮ঃ১০)। এই আয়াতে ‘বাইয়ু’ শব্দ এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে বিক্রয় করা (আরবী অভি. পৃ. ৭৪৫)। কাজেই রসূলের কাছে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে বা আমিত্বকে বিক্রয় করে দিয়ে রসূলের হাতই আল্লাহ হাত (৪৮ঃ১০) অর্থাৎ রসূল সুরতে আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করে আল্লাহর গোলাম বা ক্রীতদাস হওয়ার পরে রসুলের ইচ্ছা অনুসারে কর্ম করাই হচ্ছে আল্লাহর ইবাদত। তাহলে দেখা গেল, আগে সেজদা পরে ইবাদত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা সেজদা কর এবং আল্লাহর এবাদত কর (৫৩ঃ৬২)। অর্থাৎ রসূল সুরতে আল্লাহকে সেজদার মাধ্যমে ইবলিশ মুক্ত হওয়া। এইজন্য ইবাদতের পূর্ব শর্ত হচ্ছে পবিত্রতা অর্জন। আর সেই পবিত্রতা অর্জন হয় আদম কাবায় সেজদার মাধ্যমে। যে সেজদা ইবলিশ না করেই কাফের (২ঃ৩৪)। এখানে উল্লেখ্য যে, আদম রসূল আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি (২ঃ৩০)। কিন্তু আদম আল্লাহর শেষ খলিফা নহে বরং পৃথিবী যতদিন থাকবে ততদিন আল্লাহর জমিনে আল্লাহর প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অনেকেই বলেন, জন্মসূত্রে সকল বণি আদমই আল্লাহর প্রতিনিধি। কিন্তু না, কারণ আল্লাহ বলেন, যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে, তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন (২৪ঃ৫৫)। কাজেই সকল বনি আদম সন্তান খলিফা নহে। তাহলে বর্তমানে আল্লাহর প্রতিনিধি আছে, আর সেই প্রতিনিধিই হচ্ছে সম্যকগুরুগণ। আর এরাই হচ্ছে বর্তমান রসুল। আর এই সম্যকগুরু রসুলগণের কাছে বায়াতের মাধ্যমে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে বিক্রয় করে বা বায়াত গ্রহণ করে সেজদার মাধ্যমে ইবলিশ মুক্ত হওয়া একমাত্র উপায়। আর এটাই হচ্ছে সিরাতুল মোস্তাকিম (১৫ঃ৪১)। যে সিরাতুর মোস্তাকিম ইবলিশ গ্রহণ করে নাই এবং সেই সিরাতুল মোস্তাকিমে বসিয়া আছে উৎ পাতিয়া সেইভাবে মানুষকে পথ ভ্রষ্ট করার জন্য যেভাবে সে পথভ্রষ্ট হয়েছে (৭ঃ১৬)। এখানে উল্লেখ্য যে, প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত বলতে বা সিরাতুল মোস্তাকিম বলতে আমরা যেটা বুঝি সেই ইবাদত কিন্তু ইবলিশও করে। যেমন প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত বলতে আমরা আল্লাহতে আত্মসমর্পন করাকে বুঝি, কিন্তু ইবলিশও একমাত্র আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করে (৩ঃ৮৩)। প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত বলতে বা সিরাতুল মোস্তাকিম বলতে আমরা আল্লাহকে সেজদা করা বুঝি, কিন্তু ইবলিশও আল্লাহকে সেজদা করে (১৩ঃ১৫)। প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত বলতে বা সিরাতুল মোস্তাকিম বলতে আমরা আল্লাহকে প্রভু বলাকে বুঝি, কিন্তু ইবলিশও আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫ঃ৩৬) (৩৮ঃ৭৯)। প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত বলতে আমরা আল্লাহর পবিত্রতা এবং মহিমা বর্ণনা করাকে বুঝি, কিন্তু ইবলিশও আল্লাহর পবিত্রতা এবং মহিমা বর্ণনা করে (৫৭ঃ১)। একমাত্র প্রকৃত ইবাদত বলতে সম্যকগুরু তথা রসূলের কাছে বায়াত গ্রহণের মাধ্যমে সেজদা করে ইবলিশ মুক্ত হয়ে তার দাসত্ব করা। এটাই প্রকৃত ইবাদত, যেটা ইবলিশ করে নাই।
যাহারা আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করে উহারা ছিদ্দিক ও শহীদ (৫৭ঃ১৯) আর শহীদ বলতে যারা আল্লাহর পথে থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে। অতএব যারা আল্লাহ ও রসূলের বিশ্বাসী থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে উহারা ছিদ্দিক ও শহীদ। আল্লাহর পথে থাকা অবস্থায় যারা মৃত্যুবরণ করে তাদেরকে মৃত বলিওনা (২ঃ১৫৪)। আর উহারা আল্লাহর কাছ থেকে জীবিকা প্রাপ্ত হয় (৩ঃ১৬৯)। এখানে উল্লেখ্য যে, সমস্ত জীব তৈরীতো একই সময় (৭ঃ১৭২)। আর সেই জীব দেহে থাকা অবস্থায় বা জন্ম মৃত্যুর পরেই তাকে বনি আদম হিসাবে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং বনি আদম হিসাবে জন্ম লাভের পরে আবার তার মৃত্যু হচ্ছে। এই হিসাবে সকলেই দুই বা ততোধিক বার মৃত্যু হচ্ছে (২ঃ২৮) (৪০ঃ১১)। তবে যারা বনি আদম হিসাবে জন্ম লাভ করার পর মানব কর্ম করতে ব্যর্থ হচ্ছে, তারা আর মানব আকৃতি প্রাপ্ত হচ্ছেনা। অর্থাৎ হারাম কর্ম করলে তাকে বানর বানানো হবে (২ঃ৬৫) (৫ঃ৬০) (৭ঃ১৬৬)। আর যারা মানব কর্ম করবে তাদেরকে মানব সাদৃশ্যভাবে তৈরী করা হবে, তবে সেটা অন্য আকৃতিতে (৫৬ঃ৬১)। তবে যারা আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করে ছিদ্দিক ও শহীদ হবে (৫৭ঃ১৯) তখন তাদেরকে পুনঃজ্জীবিত করে প্রভুর কাছে প্রত্যানিত হবে (৬ঃ৩৬) সেখান থেকে তাদেরকে আর জীবদেহে পাঠানো হবে না। যেহেতু উহারা ছিদ্দিক ও শহীদ তাদেরকে মৃত বলিওনা (২ঃ১৫৪)। অর্থাৎ উহারা অমরত্ব লাভ করবে। উহারা প্রভুর কাছথেকে জীবিকা প্রাপ্ত হবে (৩ঃ১৬৯)। ১ম মৃত্যুর পর উহারা আর মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে না (৪৪ঃ৫৬)। তখন তাহারা অমরত্ব লাভ করবে। তবে যারা আল্লাহ ও রসূলের বিশ্বাস স্থাপন না করে মৃত্যুবরণ করবে তাহারা জন্ম-মৃত্যু এড়াতে পারবে না। উহারা পর্যায়ক্রমে জন্ম জন্মান্তরের মাধ্যমে পুনরায় মানব দেহ প্রাপ্ত হবে। এইভাবে জন্ম ও মৃত্যুর মাধ্যমে চলতে থাকবে ততদিন পর্যন্ত যতদিন উহারা আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করে মৃত্যুবরণ করে শহীদ ও ছিদ্দিক উপাধি প্রাপ্ত না হবে। ১ম সিংগায় ফুক দেয়ার দিন পর্যন্ত এভাবে চলবে, যখন ১ম সিংগায় ফুক দেয়া হবে তখন আকাশ ও পৃথিবীতে সকলেই মৃত্যুবরণ করবে উহারা ব্যতিত, যাহারা ইতিপূর্বে অমরত্ব লাভ করে প্রভুর কাছে প্রত্যানিত আছে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, যখন ১ম সিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখন আল্লাহ যাদের ইচ্ছা করবেন তারা ব্যতিত আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে সকলেই মৃত্যুবরণ করবে (৩৯ঃ৬৮)। আর হাশরের বিচারের পরে উহারা জান্নাতে দাখিল হবে। সেখানে তারা স্থায়ী হবে, যতদিন পর্যন্ত পৃথিবী স্থায়ী থাকবে (১১ঃ১০৬) (১১ঃ১০৭)।
বেহেস্তের ভিতরে আল্লাহ ফেরেশতাদের বললেন, আদমকে সেজদা কর। সকলেই সেজদা করিল একমাত্র ইবলিশ ব্যতিত। সে অহংকার করিল এবং কাফের হয়ে গেল। এবং আল্লাহ বলিলেন হে আদম, তুমি ও তোমার স্ত্রী একসাথে জান্নাতে বসবাস কর (সূরা- বাকারা-৩৪) (সূরা-বাকারা-৩৫) এবং ইবলিশকে বলিলেন, তুমি এখান থেকে বাহির হয়ে যাও, তুমি বিতারিত। (সূরা- হিযর-৩৪), (সূরা-সাদ-৭৭)। এই ঘটনায় প্রমাণিত হয় যে, বেহেস্তের ভিতরে মা হাওয়া আদম আঃ-কে সেজদা দিয়েছে। আয়াতে এসেছে, মা হাওয়া বেহেস্তের ভিতর উপস্থিত ছিল (সূরা- বাকারা-৩৫)। আর বেহেস্তের ভিতরে যারা ছিল তারা সকলেই সেজদা করিল একমাত্র ইবলিশ ব্যতিত। (সূরা-বারাকা-৩৪)। কাজেই এক ইনসান আরেক ইনসানকে আল্লাহর খলিফা হিসাবে কেবলা করে সেজদা দিতে পারবে না এই কথার কোন ভিত্তি নাই। অনেকেই বলে সেজদার হুকুম ছিল, ফেরেস্তা ও জ্বীন সম্প্রদায় ইনসান সম্প্রদায়কে সেজদা করবে, তাদের এক কথা ঠিক নহে, কারণ ওয়াস যুদুলী ইনসানা, তোমরা মানুষকে সেজদা কর এমন আয়াত আসে নাই। যদি এমন আয়াত আসত, তাহলে মা হাওয়া যেহেতু ইনসান, সেহেতু তিনি সেজদাকারীর আওতাভুক্ত হইতেন না, বরং তিনি সেজদাযোগ্য হইতেন। যেহেতু আয়াতে এসেছে, ওয়াস যুদুলী আদামা, তোমরা আদমকে সেজদা কর, সেহেতু মা হাওয়া ইনসান হওয়া সত্ত্বেও যদি আদমকে সেজদা না দিতেন তা হলে ইবলিশের মত কাফির হয়ে বহিস্কৃত হইত এটা নিশ্চিত। অনেকেই বলে, আদম আঃ-কে সেজদার হুকুম শুধু ফেরেস্তাদের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল, এটা অন্য কোন সম্প্রদায়ের জন্য ছিলনা। তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ ইবলিশ ছিলেন জ্বীন জাতি (সূরা-ক্বাফ -৫০)। ইবলিশ জ্বীন জাতিয় হওয়া সত্ত্বেও যখন আদমকে সেজদা না দিয়ে কাফের (সূরা-বারাকা-৩৪)। তাতে প্রমাণ হয় যে, সেজদার হুকুম শুধু ফেরেস্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলনা, বরং সকল সৃষ্টির জন্য ছিল। বিধায় মা হাওয়া ঐ সেজদার আওতাভুক্ত ছিল, এতে কোন সন্দেহ নাই। কারণ সেজদার হুকুম ছিল আল্লাহর খলিফাকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য, আর আদমকে আল্লাহ খলিফা হিসাবে নির্ধারণ করেছিলেন। (সূরা- বাকারা-৩০)। যেহেতু মা হাওয়া খেলাফত প্রাপ্ত নহে, তাই তিনি ইনসান হওয়া সত্ত্বেও ঐ সেজদা না করে অপরাধি হইতেন, এটা নিশ্চিত। কারণ জমিনের বুকে আল্লাহ খলিফা পাঠিয়েছেন সকল সৃষ্টির উপর তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন এই উদ্দেশ্যে। শুধু ফেরেস্তা ও জ্বীনদের উপর আদম আঃ প্রতিনিধিত্ব করবেন এমন নহে, বরং ফেরেস্তা, জ্বীন ও ইনসানদের উপরও আল্লাহর প্রতিনিধি হিসাবে আদম আঃ দায়িত্ব পালন করবেন। জন্মসূত্রে কিন্তু সকল বনি আদম খলিফা নহে, পৃথিবীতে যারা ঈমান আনবে এবং সৎ কর্ম করবে, তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে প্রতিনিধিত্ব দান করবেন। (সূরা-নূর-৫৫)। যাকে আল্লাহ খেলাফত দিবেন, তিনি প্রতিনিধিত্ব করবেন, বাকী বণি আদমের উপর। তাই বেহেস্তের ভিতরে আদম আঃ শুধু ফেরেস্তা ও জ্বীন সম্পদায়ের জন্যই খেলাফত ছিলেন না, বরং মা হাওয়ার উপর ও তিনি প্রতিনিধিত্ব করেছেন। আর তাই মা হাওয়া আল্লাহর খলিফা হিসাবে আদম আঃ কে মেনে নিয়েই সেজদা দিয়েছেন এটা নিশ্চিত। আর তাই দুনিয়াতে সকল স্ত্রীগণ তাদের স্বামীর আনুগত্য করে আসছে। তারপরও প্রিয় পাঠক আপনাদের জেনে রাখা ভাল যে, যদিও সকল সৃষ্টির জন্য আদমকে সেজদার হুকুম ছিল, তবে কেন আয়াতে ফেরেস্তাদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর কারণ হচ্ছে, এক সময় আল্লাহ ফেরেস্তাদের অবগতির জন্য ঘোষণা করেছিলেন যে, জমিনের বুকে আমি প্রতিনিধি নির্ধারণ করিব। (সূরা- বাকারা-৩০)। তখন শুধু ফেরেস্তারা দ্বি-মত পোষণ করেছিল, (সূরা- বাকারা-৩০)। অন্য কোন সম্প্রদায় দ্বিমত পোষণ করে নাই বিধায় সেজদার সময় ফেরেস্তাদের কথা উল্লেখ করে বলেছে, যেন কোন ভাবেই কোন অযুহাতে ফেরেস্তারা এই সেজদা থেকে বিরত না থাকে। যদিও বেহেস্তের ভিতরে আদম সেজদার ঘটনা ঘটিয়েছে, কিন্তু এর কার্যকারিতা বেহেস্তের ভিতরেই সীমাবদ্ধ নহে বরং দুনিয়াতে বনি আদমদের মধ্যে প্রচলিত আছে, যেমন ইউসুফ আঃকে সেজদা করল তার এগার ভাই। (সূরা- ইউসুফ-১০০)। সকল নবীগণের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক সেজদার সময় তোমাদের নিজের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর। (সূরা- আরাফ-২৯)। কাজেই আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা করাই ইবলিশ মুক্তির একমাত্র পথ।
আল্লাহ মানব জাতিকে সৃষ্টি করিবেন, এই জন্য আল্লাহ ঘোষণা দিলেন, আমি মাটি কাদা দিয়ে বাশার অর্থাৎ মানব সৃষ্টি করিব।(সূরা-সাদ-৭১)। উত্তম আকৃতির মধ্য দিয়ে ইনসানকে তৈরী করা হয়েছে (সূরা ত্বীন-৪)। এখানে ইনসান বা বাশার বলতে মানুষকে বুঝানো হয়েছে। মানুষ বলতে আদম ও হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য যে, আদম ও হাওয়া একই সাথে একই ফরমূলা বা পদ্ধতিতে তৈরী বা একই বস্তু দিয়ে তৈরী। কারণ যেহেতু তৈরীর সময় আয়াতে বাশার বা ইনসান শব্দ এসেছে, সেহেতু আদম ও হাওয়া একই সাথে একই ফরমূলা বা পদ্ধতিতে তৈরী বা একই বস্তু দিয়ে তৈরী। কারণ বাশার বা ইনসান বলতে আদম হাওয়াকেই বুঝায়। যদি আয়াতে বাশার বা ইনসান শব্দ না এসে শুধু ্আদম শব্দ আসত তাহলে আদম এবং হাওয়া ভিন্ন পদ্ধতিতে বা ভিন্ন বস্তুতে তৈরী প্রমাণ হতো। এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ বলেন, মাটি দিয়ে আমি বাশার বা মানুষ তৈরী করব (৩৮ঃ৭১)। উত্তম আকৃতির মধ্য দিয়ে ইনসানকে তৈরী করা হয়েছে (সূরা ত্বীন-৪)। এই দুই আয়াতে খালক শব্দ এসেছে, আর খালক শব্দের অর্থ হচ্ছে সৃষ্টি করা। (আরবি অভি. পৃ. নং-১২৩১)। আর বাশার এবং ইনসান বলতে মানুষকে বুঝানো হয়েছে। আর মানুষ বলতে আদম ও হাওয়াকে বুঝানো হয়েছে। অতএব, আদম ও হাওয়া উভয়কে উত্তম আকৃতির ছাঁচের মধ্য দিয়ে একই সময়ে মাটি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে এটা নিশ্চিত। অতঃপর হাওয়াকে আদম (আঃ) এর (সাথে বিবাহের মাধ্যমে) স্ত্রী হিসাবে নির্ধারণ করা হইল (৭ঃ১৮৯)। এই আয়াতে যাআলা শব্দ এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নির্ধারণ করা বা নির্দিষ্ট করা (আরবি অভি. পৃ. নং-১১০০)। অনেকেই এই আয়াতে যাআলা শব্দকে সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহার করে। কিন্তু যাআলা শব্দকে সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহার করা যাবেনা, কারণ সৃষ্টি করা শব্দের আরবী হচ্ছে খালক, একই আয়াতে খালক এবং যাআলা শব্দ এসেছে (৭ঃ১৮৯)। আর এই দুইটি শব্দই আরবী শব্দ, আর এই দুইটি শব্দই দুইটি অর্থে কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে ব্যবহৃত হয়েছে। দুইটি শব্দের দুইটি অর্থ, আর উদ্দেশ্যও দুইটি। এখন যদি কেহ যাআলা এবং খালক শব্দের একই অর্থ করে অর্থাৎ যাআলা শব্দকে সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহার করে তাহলে যাআলা শব্দের প্রকৃত অর্থ ও উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। সে ক্ষেত্রে উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। আর কোন আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা যাবেনা (১১ঃ২০)। আর যদি কেহ আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তার জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (২২ঃ৫১)। এই জন্য এই কোরআনের যতগুলি আয়াতে যাআলা শব্দ এসেছে সেসমস্ত আয়াতের অর্থ নির্ধারণ করা অর্থে করতে হবে। যেমন সূরা বাকারার ৩০ নং আয়াতে যাআলা শব্দ এসেছে, যে অর্থ আল্লাহ আদমকে জমিনে খলিফা নির্ধারণ করবে। অতএব, সুরা আরাফের ১৮৯ নং আয়াতের যাআলা শব্দ দিয়ে সৃষ্টি করা অর্থে ব্যবহার করা যাবে না। অতঃপর আদমকে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে (২ঃ৩০)। অতঃপর আদম (আঃ)কে খলিফা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে তাকে সেজদার নির্দেশ দিলেন (৭ঃ১১)। অতঃপর আল্লাহ বললেন, হে আদম তুমি ও তোমার স্ত্রী একই সাথে জান্নাতে বসবাস কর (২ঃ৩৫)। তাহলে দেখা গেল, আদম ও হাওয়াকে মাটি দিয়ে একইসাথে তৈরী করা হয়েছে (৩৮ঃ৭১) (৯৫ঃ৪)। অতঃপর তাদের বিবাহ দিলেন অর্থাৎ হাওয়াকে আদম (আঃ) এর স্ত্রী হিসাবে নির্ধারণ করলেন (৭ঃ১৮৯)। অতঃপর আদমকে খলিফা বা প্রতিনিধি হিসাবে নির্ধারণ করা হয়েছে (২ঃ৩০)। অতঃপর আদম (আঃ)কে সেজদার নির্দেশ দিলেন (৭ঃ১১)। অতঃপর আল্লাহ বললেন, হে আদম তুমি ও তোমার স্ত্রী একই সাথে জান্নাতে বসবাস কর (২ঃ৩৫)। অতঃপর জমিনে এসে সমগ্র মানবদেহ সৃষ্টিতে তিনটি পদ্ধতির সন্ধান পবিত্র কোরআনে এসেছে, (১) মাটি দিয়ে ইনসান তথা আদম ও হাওয়া তৈরী; (সূরা-সাদ-৭১), স্বামী স্ত্রীর মিলনের মাধ্যমে অর্থাৎ আদম ও হাওয়ার মিলনের দ্বারা। এই লক্ষে হাওয়াকে আদমের স্ত্রী হিসাবে নির্ধারণ করা হইয়াছে; (সূরা আরাফ-১৮৯)। কুন বা হও শব্দে তৈরী; (সূরা ইমরান-৫৯) (১৯:৩৫)। উপরোক্ত ৩টি পদ্ধতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আদম (আঃ) মাটি দিয়ে তৈরী. (সূরা ইমরান-৫৯)। আর ঈসা (আঃ) কুন শব্দে তৈরী (সূরা ইমরান-৫৯) এবং সকল বনি আদমগণ পিতা মাতার মিলনের মাধ্যমে তথা নফসের মাধ্যমে সৃষ্টি। (সূরা আরাফ-১৮৯)। এখানে উল্লেখ্য যে আদমের স্ত্রী হাওয়া (আঃ) এই তিন পদ্ধতির যে কোন এক পদ্ধতিতে তৈরী। তবে তিনি পিতা মাতার মিলনের মাধ্যমে তথা নফসের মাধ্যমে সৃষ্টি হয় নাই এটা নিশ্চিত, কারণ তিনিই প্রথম নারী। তিনি কুন শব্দে তৈরী এই মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কুরআনে আসে নাই, কারণ আদম ও ঈসা (আঃ) এর সৃষ্টির দৃষ্টান্ত দিতে গিয়ে আল্লাহ বলেন, আমি আদমকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছি, আর ঈসা (আঃ)কে কুন শব্দে তৈরী করেছি (সূরা ইমরান-৫৯)। কিন্তু আদমকে মাটি দিয়ে তৈরী এবং হাওয়াকে কুন শব্দে তৈরী করা হয়েছে এই মর্মে কোন আয়াত পবিত্র কুরআনে আসে নাই। এতে প্রমাণ হয় মা হাওয়াকে কুন শব্দে তৈরী করা হয় নাই। তাহলে নিশ্চয়ই মা হওয়াকে মাটি দিয়ে তৈরী করা হয়েছে। তাহলে দেখা গেল আল্লাহ মাটি দিয়ে বাবা আদম (আঃ) এবং মা হাওয়া (আঃ)কে তৈরী করেছেন, এটা নিশ্চিত। তার পূর্বে জ্বীনকে অগ্নিথেকে এবং ফেরেস্তাদেরকে নূর থেকে সৃষ্টি করেছেন। এই ৪ জন সৃষ্টির মধ্যে জমিনে একজন আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব করবেন এই লক্ষে আল্লাহ ঘোষণা করিলেন, ‘আমি জমিনে আমার প্রতিনিধি নির্ধারণ করিব’ (সূরা বাকারা-৩০)। এই আয়াতে যা’আলা শব্দ এসেছে। দেখা গেল যদি আল্লাহ ফেরেস্তাদেরকে খেলাফত দেয় তাহলে বাকী তিনজন অর্থাৎ আদম, হাওয়া ও জ্বীন এরা সকলেই ফেরেস্তাদেরকে সেজদা করবে। আবার যদি জ্বীনকে খেলাফত দেয় তাহলে ফেরেস্তা ও ইনসান তথা আদম ও হাওয়া সকলেই জ্বীনকে সেজদা করবে। আর যদি ইনসানকে খেলাফত দেয় তাহলে ফেরেস্তা ও জ্বীন উভয়ই আদম ও হাওয়াকে সেজদা দিবে। কারণ আদম ও হাওয়া উভয়ই ইনসান। সে ক্ষেত্রে মা হাওয়া (আঃ)ও সেজদার যোগ্য হয়ে যায়। আর যদি শুধু মা হাওয়া (আঃ)কে খেলাফত দেয় তাহলে ফেরেশতা, জ্বীন ও বাবা আদম (আঃ) সেজদা দিবে। আর সেই মতে জমিনে এসে মা হাওয়াই প্রতিনিধিত্ব করতো। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআন গবেষণা করে দেখা গেছে, তোমরা ফেরেশ্তাকে সেজদা করবে এই মর্মে কোন আয়াত আসে নাই। তাতে বুঝা যায় ফেরেস্তারা খেলাফত পায় নাই, আবার তোমরা জ্বীন সম্প্রদায়কে সেজদা করবে এই মর্মে কোন আয়াত আসে নাই। তাতে বুঝা যায় জ্বীন সম্প্রদায় খেলাফত পায় নাই, আবার তোমরা ইনসানকে সেজদা করবে এই মর্মে কোন আয়াত আসে নাই। তাতে বুঝা যায় সকল ইনসানই খেলাফত পায় নাই। তোমরা হাওয়া (আ.)কে সেজদা কর এমন আয়াত আসে নাই। আয়াতে এসেছে ওয়াসজুদু লি আদামা, তোমরা আদমকে সেজদা কর। (সূরা আরাফ-১১)। এতে প্রমাণ হয় একমাত্র আদমই খেলাফতের দাবীদার। যেহেতু তোমরা ইনসানকে সেজদা কর, আয়াত আসেনাই বিধায় মা হাওয়া ইনসান হওয়া সত্ত্বেও খেলাফতের অধিকারী নয়। এজন্য তিনি সেজদার অধিকারী নয়, কারণ খেলাফত যেখানে, সেজদা সেখানে। অনেকেই বলেন ইনসানকে শ্রেষ্ঠ জীব হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে এই সেজদার হুকুম হয়েছিল। এ কথাটা ঠিক নহে, কারণ আয়াতে ওয়াসজুদু লি ইনসানা বলা হয় নাই, কারণ ইনসানকে সেজদা কর বললে মা হাওয়া সেজদাযোগ্য হয়ে যায়। সে ক্ষেত্রে বেহেস্তের ভিতরে যখন একই সাথে বাবা আদম ও মা হওয়া অবস্থান করেছিল (বাকারা-৩৫), তখন ত ফেরেস্তারা বাবা আদম ও মা হওয়া উভয়কেই সেজদা করার বিধান প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু বেহেস্তের ভিতরে মা হওয়া উপস্থিত থাকা সত্বেও ফেরেস্তরা তাকে সেজদা করে নাই। তাতে বুঝা গেল ইনসানকে শ্রেষ্ঠ জাতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষে আদম সেজদার হুকুম হয় নাই, এবং খেলাফতকে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে ঐ সেজদার হুকুম ছিল, এটা নিশ্চিত। তাছাড়াও আল্লাহ বলেন, যারা ঈমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। (সূরা বানিয়্যা-৯৭)। যেহেতু আদম ছিল আল্লাহর খলিফা, অতএব সকল সৃষ্টি আদমকে কেবলা করে আল্লাহকে সেজদা করবে, এটাই ছিল আদম সৃষ্টির উদ্দেশ্য বা রহস্য। সেক্ষেত্রে বেহেস্তের ভিতর যারা যারা উপস্থিত ছিল, (ফেরেশস্তা, জ্বীন ও মা হওয়া) তারা সকলেই আদমকে সেজদা দিয়েছে একমাত্র ইবলিশ ব্যতীত। (সূরা বাকারা-৩৪)। ইবলিশ আদমকে সেজদা না দিয়ে কাফির হয়ে গেল (সূরা বাকারা-৩৪)। এবং আদমকে বলা হইল তুমি এবং তোমার স্ত্রী একই সাথে জান্নাতে বসবাস কর। (সূরা বাকারা-৩৫)। আর ইবলিশকে বহিষ্কার করা হইল। (সূরা হিযর-৩৪)। কাজেই যেহেতু আদম সেজদার সময় বেহেস্তের ভিতরে মা হাওয়া উপস্থিত ছিল, এই আয়াতে তার প্রমাণ। আর উপস্থিত সকলেই আদমকে সেজদা করিল একমাত্র ইবলিশ ব্যতীত। (সূরা বাকারা-৩৪)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় মা হাওয়া ঐ সময় আদম (আঃ)কে সেজদা করেছেন। কারণ আদমতো সকল সৃষ্ট জীবের জন্য খলিফা ছিল, শুধু জ্বীন ও ফেরেস্তাদের জন্য তিনি প্রতিনিধি ছিল এমনটা নয়, বরং তার স্ত্রী সহ সকল বণি আদমের জন্যই তিনি খলিফা ছিলেন, আর যারা তাকে খলিফা হিসাবে মেনে সেখানে আনুগত্য বা সেজদা করবেনা তারাই ইবলিশের দলভুক্ত বলে গণ্য হবে। যেহেতু বেহেস্তের ভিতরে আদমের স্ত্রী উপস্থিত ছিলেন (বাকারা -৩৫) আর যদি তিনি সেখানে উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও আদম (আঃ)কে সেজদা না দিতেন তাহলে তাকেও ইবলিশের সাথে বহিষ্কার ঘোষণা দেওয়া হতো। যেহেতু মা হাওয়াকে বহিষ্কার ঘোষণা দেওয়া হয় নাই, একমাত্র আদমকে সেজদা না দেওয়ার কারণে ইবলিশকে বহিস্কার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, এতে প্রমাণ হয় মা হাওয়া বেহেস্তের ভিতরে আদম আঃ কে সেজদা দিয়েছে। আর তাই দুনিয়াতে সকল স্ত্রীগণ তার স্বামীর আনুগত্য করে থাকেন। আর তারই ধারাবাহিকতায় ইউসুফ আঃকে সেজদা দিল ইউসুফের ১১ ভাই। (ইউসুফ-১০০)। অনেকেই বলে আদম (আঃ) এবং ইউসুফ আঃ কিংবা অন্যান্য নবীগণ তারা কোন আদম কাবায় সেজদা দিয়েছে? এই মর্মে আল্লাহ নবীদের উদ্দেশ্যে বলেন, তোমরা প্রত্যেক সেজদার সময় তোমাদের চেহারা প্রতিষ্ঠিত কর। (সূরা আরাফ-২৯)। এই নির্দেশ মতে আদম আঃ নিজের চেহারাকে দৃষ্টিতে আয়ত্ব করে নিজ চেহারাকে কেবলা করে সেজদা দিয়েছেন। আর সকল নবীগণই তাহাদের নিজের চেহারাকে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত করে সেজদা দিয়েছেন। এইভাবেই আদম কাবায় সেজদা দিয়ে সকলেই ইবলিশ থেকে পবিত্র হবে।
অনেকে আছে তারা আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করে, অথচ আল্লাহ ও রসূলকে একাকর ও অবিচ্ছিন্নভাবে অর্থাৎ রসূলের হাতই আল্লাহর হাত তারা এই বিশ্বাস করে না, বরং তারা রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে বা ঝবঢ়ধৎধঃব করে বা পৃথক করে, তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেনÑ ইন্নাল্লাজিনা ইয়াকফুরুনা বিল্লাহি ওয়া রসূলিহি ওয়া উরিদুনা আইয়ুফাররিকু বায়নাল্লাহা ওয়া রুসুলিহি (অর্থাৎ উহারাই আল্লাহ ও রসূল অস্বীকারকারী যাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে অর্থাৎ রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে বা উরংঃবহপব করে অর্থাৎ পৃথক করে বা দূরত্ব করে (সূরা নেসা-১৫০) অর্থাৎ এই আয়াত অনুসারে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে উহারাই আল্লাহ রসূল অস্বীকারকারী কাফের। এখানে উল্লেখ্য যে এই আয়াতে ফাররিকু শব্দ আসছে। যার অর্থ বিচ্ছিন্ন করা। সুরা ইমরানের ১০৩ নং আয়াতে ফাররিকু শব্দের অর্থ বিচ্ছিন্ন অর্থে করা হয়েছে। এখানে আরো উল্লেখ্য বর্তমান অনুবাদকরা দুই রসুলের মধ্যে পরস্পর বিচ্ছিন্ন বা ফারাক অর্থ দেখায়, কিন্তু আয়াতে আল্লাহ ও রসুলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অর্থে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। কারণ আয়াতে উরিদুনা আইয়ুফাররিকু বাইনাল্লাহা ওয়ারসুলিহি কথা উল্লেখ আছে। অর্থাৎ আল্লাহ ও রসুলের মধ্যে বিচ্ছিন্ন করলে কাফের হবে মর্মে আয়াতটি নাযিল হয়েছে। পক্ষান্তরে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে না উহারাই মোমিন। এই মর্মে আল্লা আরো বলেন, ওয়াল্লাজিনা আমানুবিল্লাহি ওয়া রসুলিহি ওয়া লাম উফারিরকু বায়না আহাদা মিনহুম, উলাইকা সাওফা উতিহিম উযুরাহুমÑ বরং যারা আল্লাহর রসূল বিম্বাস করে এবং উহাদের মধ্যে কোনো ফারাক করে না। অথাৎ রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে না বা উরংঃবহপব করে নাঅর্থাৎ পৃথক করে না বা দূরত্ব করে না। উহাদের জন্য রহিয়াছে পুরস্কার (সূরা নেসা আয়াত-১৫২)। এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াত নিয়েই অনেকেই প্রমাণ করতে চায় যে, আল্লাহর রসূলের মধ্যে কোন উরভভবৎবহঃ বা পার্থক্য নেই। কিন্তু তাদের কথা ঠিক নহে কারণ আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। রসূল হচ্ছে সৃষ্ট আল্লাহ হচ্ছে শ্রষ্ঠা। রসূলের জন্ম-মৃত্যু আছে পক্ষান্তরে আল্লাহর জন্ম-মৃত্যু নেই। রসূলের সাথে আল্লাহ আছে। অর্থাৎ রসূল হচ্ছে আল্লাহ সংশ্লিষ্ট। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া রসূল চলতে পারে না পক্ষান্তরে আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নহে আল্লাহ একক। তবে এই আয়াতের উদ্দেশ্য হবে রসূলের সাথে আল্লাহ আছে বিধায় রসূল থেকে আল্লাহকে পৃথক না করে অর্থাৎ ঝবঢ়ধৎধঃব না করে আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করা। আল্লাহ রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বাস করা। রসূলের হাতই আল্লাহর হাত (সূরা আল-ফাতহ-১০)। অর্থাৎ রসূল সুরতে আল্লাহ বিম্বাস করে সেজদা দিলে রসূল সূরতে, স্বপ্নে আল্লাহর দর্শন হয়। কারণ ইবলিশ যেহেতু আদম সেজদার সামিল হয় না (সূরা হিজর-৩৩) সেহেতু স্বপ্নে আদম সেজদাকারী চেহারায় ইবলিশ আসে না। তখন কিন্তু রসূল সুরতে স্বপন্,ে রসূলও আসে নাই ইবলিশও আসে নাই। রসূল সুরতে স্বপ্নে স্বয়ং আল্লাহই আসে। তখন কিন্তু রসূলরূপে আর রসূল আসে নাই স্বয়ং আল্লাহই আসে। এ মর্মে লালন সাইজি তাঁর গানের ভাষায় বলেছেন- যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসূল, ইহাতে নাই কোনো ভুল। খোদাও সে হয়, এ কথা বলে না লালন কোরানে কয়। এবার এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমরা যখন রসূলে কাছে যাবে তখন তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনিটি থাকবে যে আমরা তো আল্লাহর কাছেই গেলো। যখন তোমরা রসূলের কাছে বায়াত গ্রহণ করবে তখন তো আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহন করলে। (সূরা ফাতহ-১০) কারণ তাদের হাতের উপরই আল্লাহর হাত। আর এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন আমি তোমাদের সাথে আছি। (সূরা হাদিদ-৪)। আল্লাহ তো রসূলের ভেতরই সক্রিয় আছেন। (সূরা আনফাল-১৭) আল্লাহ মানুষের গর্দানের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটে। (সূরা কাফ-১৬) আল্লাহ মানুষের অতি নিকটে (সূরা বাকারা-১৮৫) যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসূল। অতএব রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক না করে রসূল সূরতে আল্লাহ বিশ্বাস করাই একত্ববাদে দ্বীন। এখানে উল্লেখ্য যে, ফারাক শব্দ অর্থ পৃথক করা। (আরবি অভিধান পৃ. নং ১৮৭৯) আর পৃথক শব্দের ইংরেজি হচ্ছে ঝবঢ়ধৎধঃব করা (ইংরেজি অভিধান পৃ. নং-৭০৩)। অর্থাৎ সূরা নেসার ১৫০ নং আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব বা উরংঃবহপব না করে বিশ্বাস করা। বরং রসূলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করে রসূলের মধ্যে ব্যক্তি রসূলকে বিলীন করে সেই সুরতে আল্লাহ বিম্বাস করে সেখানে আল্লাহকে বর্তমান জেনে সেজদা করা হয়। কিন্তু যারা নবী মোহাম্মদ (সা.)কেই রসুল হিসেবই বিশ্বাস করেন সে ক্ষেত্রে যেহেতু রসুল জীবিত নহে। ঐ হাত আল্লাহর হাত এটা বলা সম্ভব হচ্ছে না আবার নবী (সা.)-এর মাজার, আল্লাহর মাজার এটাও বলা সম্ভব নয়। কারণ আল্লাহ তো মরে না বিধায় এই মাজার আল্লাহর মাজার বলা সমীচীন নহে। সেক্ষেত্রে রসুল এবং আল্লাহকে আলাদা না করে সুরা নেছার ১৫০ নং আয়াত অনুসারে মুমিন হওয়া তাদের জন্য কঠিন বিধায় সম্যক গুরুকেই রসুল বিশ্বাস করে সেই হাতে হাত রেখেই আল্লাহ ও রসুলকে পৃথক না করে সুরা নেছার ১৫০ নং আয়াত অনুসারে মুমিন হওয়া সহজ। এটাই হচ্ছে রসূলের মাধ্যমে ঈমান পরীক্ষা করা। (সূরা ফুরকান-২০)। উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেলো যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে বা ঝবঢ়ধৎধঃব (পৃথক) করে উহারা সুরা নেসার ১৫০নং আয়াত অনুসারে আল্লাহ ও রসুলকে অস্বীকারকারী বল গণ্য। আর আল্লাহ ও রসুলকে অস্বীকারকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করিবে না (৯ঃ৮০)। আর আল্লাহ পাকের দয়া ক্ষমা ছাড়া কেউ শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না (২৪ঃ১৪)। আর যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে তারাই ক্ষমা পাবে (৩ঃ১৩২)। কাজেই রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে যারা আল্লাহর সাথে রসূলের নাম জপনা করে ফলে উহারা আল্লাহ রসূল অস্বীকারকারী হওয়ার কারণে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই উহারা যখনই রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব বা পৃথক করে তখনই উহারা আল্লাহর সাথে রসুলের নাম জপনাকরে। ফলে উহারা সুরা জিনের ১৮নং আয়াতে অমান্যকারী বলে গণ্য হয়। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।
আল্লাহ বলেন, দ্বীনের বিষয় সকাল কিছু একমাত্র আল্লহরই প্রাপ্য। (সূরা যুমার:৩) রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য আল্লাহর হয়। (সূরা নেসা: ৮০) তাই রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য দ্বীনের আনুগত্যে গণ্য হয়। রসূল ব্যতীত দ্বীনের ক্ষেত্রে অন্য কোনো তৃতীয় ব্যক্তির আনুগত্যে করলে সে আনুগত্য রসূলের হবে এমন কোনো আয়াত কোরআনে নেই। অর্থাৎ দ্বীনের আনুগত্য আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই জন্য আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ বিশ্বাস কর ও রসূল বিশ্বাস কর। বলিও না তিন। (সূরা নেসা ঃ ১৭১)। যারা তিন পন্থী তারা বলে, আল্লাহ তো তিনের মধ্যে একজন। (সূরা মায়েদাঃ ৭৩)। অতএব দ্বীনের ক্ষেত্রে একমাত্র রসূল ব্যতীত তৃতীয় কোনো ব্যক্তির আনুগত্য করলে সেটা শেরেকে গণ্য হবে এটা নিশ্চিত। অনেকেই দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের দলের আমিরগণের আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু আমিরগণকে তারা রসূল জ্ঞান করে না। তাহলে দ্বীনের ক্ষেত্রে তাদের আমিরগণের আনুগত্য করলে সেটা শেরেকে গণ্য হবে। আবার যারা উলামাগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু তারা উলামাগণকে রসূল জ্ঞান করে না। সেহেতু একই যুক্তিতে উলামাগণকে বা আলেমগণকে বা দলের আমিরগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনগত্য করে তারাও শেরেকে গণ্য। আবার যারা মসজিদের বেতনভুক্ত ইমামগণকে দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করে। যেহেতু মসজিদের ইমামগণকে তারা রসূল জ্ঞান করে না সেহেতু সেই একই যুক্তিতে ঐসকল ইমামগণের দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করাও শেরেকে গণ্য। আবার যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে পীরগণকে আনুগত্য করে থাকে। যেহেতু তাদের পীরগণকে তারা রসূল হিসেবে বিশ্বাস করে না বিধায় সেই সকল তিনপন্থী পীরপন্থীগণের দ্বীনের ক্ষেত্রে আনুগত্য করাও শেরেকে গণ্য। (বি.দ্র. ১ম খন্ডের তিনপন্থী পীরপন্থী শেরেকে গণ্য অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন)। আবার যারা আল্লাহ সম্পর্কে ধারণা বা কল্পনা বা অনুমান করে সেটাও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আল্লাহ সম্পর্কে ধাণে, কল্পনা ও অনুমান মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। (সূরা ইউনুস: ৩৬) এটা এই জন্য গ্রহণযোগ্য নয় যে, তারা আল্লাহকে যেমনটি ধারণাকরে ংিবা যেমনটি অনুমান করেন আল্লাহ তো তেমনটি নহেন বিধায় আল্লাহ সম্পর্কে তাদের মস্তিস্কের এই কাল্পনিক মূর্তিটি আল্লাহ সম্পর্কে একটি মেসেলে গণ্য হয়। আর আল্লাহ সম্পর্কে কোনো মেসেল দেওয়া যাবে না। (সূরা নহল: ৭৪) ফলে যারা আল্লাহর কাল্পনিক মূর্তি মস্তিস্কে রেখে আল্লাকে সেজদা করে সেটাও শেরেকে গণ্য। আবার যারা আল্লাহকে অনুমানের উপর বিশ্বাস করে কাবা ঘরেহজ্ব করতে যান তাদের মস্তিস্কে কাবা ঘরের ছবি সেজদার সময় স্থির হয়ে যায় বিংবা যারা কাবা ঘরের ছবিকে কল্পনায় এনে সেখানে সেজদা করে তাদের সেজদাও শেরেক হয়। কারণ আল্লাহ ছাড়া সেজদা হারাম। (সূরা জিন : ১৮) এই জন্য ওয়াসজুদুলি হেরেম শরিফ কিংবা ওয়াজুদুলি মাকামে ইব্রাহিম কিংবা ওযাসজুদুলি বায়তুল্লাহ। অর্থাৎ তোমরা কাবা ঘরকে সেজদা কর কিংবা তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে সেজদা কর, কিংবা তোমরা আল্লাহর ঘর কে সেজদা কর এমন আয়াত কোরআনে আসেনি। তবে আয়তে এসেছে আত্তাখাযু মিন মাকামে এবরাহিম মু-উছাল্লি। (বাকারা : ১২৫) অর্থ তোমরা মাকামে ইবরাহিমকে উছাল্লিা আদায় করার স্থান হিসেবে সাব্যস্ত কর। এখানে উল্লেখ্য যে, উছাল্লি আর সেজদা একশব্দ নয়। কারণ সেজদা হচ্ছে উপাসনামূলক শব্দ। আর উছাল্লি হচ্ছে প্রশংসামূলক শব্দ। করণ আল্লাহ বান্দার জন্য উছাল্লি কামনা করে। (ষূরা আহযাব : ৪৩) {বি.দ্র. ১ম খন্ড পুস্তকের ২৪ নং অধ্যায়টি বিস্তারিত দেখুন} অতএব সূরা বাকারার :১২৫নং আয়াত অনুসারে মাকামে ইবরাহিমকে প্রভুর প্রশংসা গুণকীর্তন করার স্থান হিসাবে স্ব্যস্ত করতে বলা হয়েছে। তবে সেটা সেজদার লক্ষ্যবস্তু নয়। এ জন্য যারা কাবা ঘরের ছবিতে সেদার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে অন্তরে স্থির করে সেজদা করে তারাও শেরেকে গণ্য। কারণ আল্লাহ ঘোষণা করেন যে, মুশরিক (হাজী) দের দায় আল্লহ নেবেন না বিংবা রসূল ও তাদের দায়ভার নেবেন না। (তওবা : ৩) আর এই জন্য শেরেক যুক্ত মুশরিকদেরকে কাবা ঘরে যেতে নিষেধ করা হয়েছে (সূরা তওবা :২৮)। আবার যারা আল্লাহর সাথে অন্যদের নাম ডাকে তারাও শেরেকে গণ্য। কারণ আলÍাহ বলেন, তোমরা আল্লাহ সাথে কাউকে ডেক না। (সূরা জিন:১৮) বর্তমানে এক শ্রেণীর লোক আছে, যারা কোনো মূর্তি পূজা করে না আবার কোনো দেবদেবীর উপাসনাও করে না। উহারা কেবল আল্লহকেউ প্রভু বলে বিশ্বাস করে। কিন্তু উহারা আল্লাহর সাথে তাহাদের রসূল মূসা (আঃ) কিংবা তাহাদের রসূল ঈসা (আঃ) কিংবা তাদের রসুল মোহাম্মদ (সা.)-এর নাম জপনা করে। ফলে সূরা জিনের ১৮নং আয়াত অনুসারে তারাও শেরেকে গণ্য। যখন তাদের বলা হলো, তোমরা (শেরেক পথ পরিহার করে) পরিপূর্ণভাবে আল্লাহতে আতœসমর্পণ কর। (সূরা বাকারা :২০৮) কারণ আল্লহতে আতœসমর্পণ করাই আল্লাহর মনোনীত দ্বীন (সূরা ইমরান: ৮৫) তখন তারা বলল, আমরা তো আমাদের দ্বীনেই আছি। তখন তাদেরকে বলা হল, তোমরা যে আল্লাহর সাথে তোমাদের রসূল ঈসা আ. ও মুসা (আ:) কিংবা রসুল মোহাম্মদ (সা.)-এর নাম জপনা করছ। ফলে তোমরা আল্লাহর সাথে তোমাদের রসুল মোহাম্মদ (সা.) -এর নাম জপনা করে শেরেকে গণ্য হচ্ছ। কিন্তু আল্লাহ বলেন, তোমরা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে ডেক না। (সূরা জিন: ১৮)। তখন তারা বলল, এই যুক্তিতে আল্লাহর সাথে আমাদের রসূলের নাম জপনা করলে যদি শেরেক হয় তাহলে তোমরা যখন আল্লাহর সাথে সম্যক গুরু তোমাদের রসূলের নাম ডাক তাহলে তো তোমরাও আমাদের মতো শেকেকে গন্য। তাদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন, কুল ইন্নানী বারিউন মিম্মা তুশরিকা। বল, তোমাদের মতো শেরেক থেকে আমি মুক্ত। (সুরা আনাম: ১৯) তখন তারা বলল, তোমাদেরটা কিভাবে শেরেক মুক্ত হয়? আমরা রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব না করে আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বাস করে অর্থাৎ সূরা আল ফাতহ এর ১০ নং আয়াত অনুসারে রসূলের হাতই আল্লাহর হাত বিশ্বাস করি এ জন্য আমাদেরটা শেরেকমুক্ত। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আল্লাজিনা ইয়াকফুরুনা বিল্লাহি ওয়া রসূলিহি ওয়া উরিদুনা আইয়ুফাররিকু বায়নাল্লাহা ওয়া রুসুলিহি (অর্থাৎ উহারাই আল্লাহ ও রসূল অস্বীকারকারী যাহারা ইচ্ছাকৃতভাবে রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে অর্থাৎ রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে বা উরংঃবহপব করে অর্থাৎ পৃথক করে বা দূরত্ব করে (সূরা নেসা-১৫০) অর্থাৎ এই আয়াত অনুসারে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে উহারাই আল্লাহ রসূল অস্বীকারকারী কাফের। পক্ষান্তরে যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে না উহারাই মোমিন। এই মর্মে আল্লা আরো বলেন, ওয়াল্লাজিনা আমানুবিল্লাহি ওয়া রসুলিহি ওয়া লাম উফারিরকু বায়না আহাদা মিনহুম, উলাইকা সাওফা উতিহিম উযুরাহুমÑ বরং যারা আল্লাহর রসূল বিশ্বাস করে এবং উহাদের মধ্যে কোনো ফারাক করে না। অথাৎ রসূল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে না বা উরংঃবহপব করে নাঅর্থাৎ পৃথক করে না বা দূরত্ব করে না। উহাদের জন্য রহিয়াছে পুরস্কার (সূরা নেসা আয়াত-১৫২)। এখানে উল্লেখ্য যে, এই আয়াত দিয়েই অনেকেই প্রমাণ করতে চায় যে, আল্লাহর রসূলের মধ্যে কোন উরভভবৎবহঃ বা পার্থক্য নেই। কিন্তু তাদের কথা ঠিক নহে কারণ আল্লাহ ও রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। রসূল হচ্ছে সৃষ্ট আল্লাহ হচ্ছে শ্রষ্ঠা। রসূলের জন্ম-মৃত্যু আছে পক্ষান্তরে আল্লাহর জন্ম-মৃত্যু নেই। রসূলের সাথে আল্লাহ আছে। অর্থাৎ রসূল হচ্ছে আল্লাহ সংশ্লিষ্ট। আল্লাহর সাহায্য ছাড়া রসূল চলতে পারে না পক্ষান্তরে আল্লাহ কারো মুখাপেক্ষী নহে আল্লাহ একক। তবে এই আয়াতের উদ্দেশ্য হবে রসূলের সাথে আল্লাহ আছে বিধায় রসূল থেকে আল্লাহকে পৃথক না করে অর্থা ঝবঢ়ধৎধঃব না করে আল্লাহ ও রসূল বিশ্বাস করা। আল্লাহ রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে বিশ্বাস করা। রসূলের হাতই আল্লাহর হাত (সূরা আল-ফাতহ-১০)। অর্থাৎ রসূল সুরতে আল্লাহ বিম্বাস করে সেজদা দিলে রসূল সূরতে, স্বপ্নে আল্লাহর দর্শন হয়। কারণ ইবলিশ যেহেতু আদম সেজদার সামিল হয় না (সূরা হিজর-৩৩) সেহেতু স্বপ্নে আদম সেজদাকারী চেহারায় ইবলিশ আসে না। তখন কিন্তু রসূল সুরতে স্বপন্,ে রসূলও আসে নাই ইবলিশও আসে নাই। রসূল সুরতে স্বপ্নে স্বয়ং আল্লাহই আসে। তখন কিন্তু রসূলরূপে আর রসূল আসে নাই স্বয়ং আল্লাহই আসে। এ মর্মে লালন সাইজি তাঁর গানের ভাষায় বলেছেন- যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসূল, ইহাতে নাই কোনো ভুল। খোদাও সে হয়, এ কথা বলে না লালন কোরানে কয়। এবার এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমরা যখন রসূলে কাছে যাবে তখন তোমাদের দৃষ্টিভঙ্গি এমনিটি থাকবে যে আমরা তো আল্লাহর কাছেই গেলাম। যখন তোমরা রসূলের কাছে বায়াত গ্রহণ করবে তখন তো আল্লাহর কাছেই বায়াত গ্রহন করলে। (সূরা ফাতহ-১০) কারণ তাদের হাতের উপরই আল্লাহর হাত। আর এই মর্মে আল্লাহ বলেন, তোমরা যেখানেই থাক না কেন আমি তোমাদের সাথে আছি। (সূরা হাদিদ-৪)। আল্লাহ তো রসূলের ভেতরই সক্রিয় আছেন। (সূরা আনফাল-১৭) আল্লাহ মানুষের গর্দানের শাহ রগ অপেক্ষাও নিকটে। (সূরা কাফ-১৬) আল্লাহ মানুষের অতি নিকটে (সূরা বাকারা-১৮৫) যিনি মুর্শিদ/গুরু তিনি রসূল। অতএব রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক না করে রসূল সূরতে আল্লাহ বিশ্বাস করাই একত্ববাদে দ্বীন। এখানে উল্লেখ্য যে, ফারাক শব্দ অর্থ পৃথক করা। (আরবি অভিধান পৃ. নং ১৮৭৯) আর পৃথক শব্দের ইংরেজি হচ্ছে ঝবঢ়ধৎধঃব করা (ইংরেজি অভিধান পৃ. নং-৭০৩) । অর্থাৎ সূরা নেসার ১৫০ নং আয়াতের ভাবার্থ হচ্ছে রসূল থেকে আল্লাহ ঝবঢ়ধৎধঃব বা উরংঃবহপব না করে বিশ্বাস করা। বরং রসূলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করে রসূলের মধ্যে ব্যক্তি রসূলকে বিলীন করে সেই সুরতে আল্লাহ বিম্বাস করে সেখানে আল্লাহকে বর্তমান জেনে সেজদা করা হয়। এটাই হচ্ছে রসূলের মাধ্যমে ঈমান পরীক্ষা করা (সূরা ফুরকান-২০)। উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেলো যারা রসূল থেকে আল্লাহকে ফারাক করে বা ঝবঢ়ধৎধঃব (পৃথক) করে উহারা সুরা নেসার ১৫০ নং আয়াত অনুসারে আল্লাহ ও রসুলকে অস্বীকারকারী বলে গণ্য। আর আল্লাহ ও রসুলকে অস্বীকারকারীকে আল্লাহ কখনও ক্ষমা করিবে না (৯ঃ৮০)। আর আল্লাহ পাকের দয়া ক্ষমা ছাড়া কেউ শাস্তি থেকে রেহাই পাবে না (২৪ঃ১৪)। আর যারা আল্লাহ ও রসূলের আনুগত্য করবে তারাই ক্ষমা পাবে (৩ঃ১৩২)। কাজেই রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব করে যারা আল্লাহর সাথে রসূলের নাম জপনা করে ফলে উহারা আল্লাহ রসূল অস্বীকারকারী হওয়ার কারণে ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তাই উহারা যখনই রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎধঃব বা পৃথক করে তখনই উহারা আল্লাহর সাথে রসুলের নাম জপনা করে। ফলে উহারা সুরা জিনের ১৮নং আয়াতে অমান্যকারী বলে গণ্য হয়। (কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।) রসূলের সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করা এটাই প্রকৃত ইমান। আর আল্লাহপাক রসূলের মাধ্যমে এই ঈমান পরীক্ষা নিবেন (সুরা হুদ-২০), সেই পরীক্ষায় লেবাসধারী মোমিনগণও আক্রান্ত হয়। এই পরীক্ষা সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, এমন একটি কঠিন পরীক্ষা করা হবে যে পরীক্ষায় শুধু জালেমরাই আক্রান্ত হবে না। (সূরা আনফাল-২৫)। এইভাবে আমরা রসূল সুরতে আল্লাহ বিম্বাস করছি বিধায় আমাদেরটা শেরেকমুক্ত। কারণ রসূলের মধ্যে রসূলকে বিলীন করে সেখানে যে আল্লাহর অবস্থান আছে। রসূল সুরতে সেই আল্লাহকেই সেজদা করছি। রসূলকে করছি না। বা আল্লাহর সাথে রসূলকে ডাকছি না। আর এটা আমাদের পক্ষে এইজন্য সম্ভব হচ্ছে যে, আমাদের রসূল উপস্থিত আছে। কাজেই আমাদের রসূলতো বর্তমান বা উপস্থিত আছেন। যেহেতু তোমরা তো মুসা (আ.) কে কিংবা ঈসা (আ.)কে কিংবা অনুপস্থিত রসূলগণকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস কর। কিন্তু তোমাদের রসূলতো বর্তমান নেই। ফলে তোমরা আল্লাহর সাথে রসূলের নাম জপনা করে সূরা জিনের ১৮ নং আযাতের পরিপন্থি গণ্য। তাই বর্তমান রসূল তথা সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে সেখানে বায়আত গ্রহণের মাধ্যমে সেই রসূল সুরতে আল্লাহকে সেজদা করা শেরেক মুক্তির একমাত্র পথ। এই পথে না এসে যারা ঈসা (আ.)কে কিংবা মুসা (আ.)কে কিংবা অনুপস্থিত রসূগণকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস করে আল্লাহর সাথে ঈসা (আ.)কে কিংবা মুসা (আ.)কে কিংবা অনুপস্থিত রসূগণকে রসূল বিশ্বাস করে আল্লাহর সাথে রসূলের নাম জপনা করে তারা সূরা জিনের ১৮ নং আযাত অনুসারে শেরেকের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থ। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, শেরেক করলে কর্ম নিষ্ফল হয়। (সুরা জুমার-৬৫)। শেরেক সবচেয়ে বড় জুলুম (সুরা লোকমানÑ১৩) শেরেক করলে ঈমান কলুষিত হয়। তাই আল্লাহ বলেন, তোমাদের ঈমানকে জুলুম দ্বারা কলুষিত করো না (সূরা আনাম-৮২)। শেরেকের অপরাধ কখনোই ক্ষমা করা হব্ েনা (সূরা নেসাÑ ৪৮) যারা শেরেক করে তারা মুশরেক। আল্লা বলেন তোমরা মুশরেকগণকে উপেক্ষা কর (হিযর-৯৪)। আর মুশরেকগণতো পাপিষ্ট। আর আল্লাহ বলেন, তোমরা পাপিষ্টগণের সংঘ ধারণ করোনা (দাহর-২৪)। তাই যারা সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে তার সংঘ ধারণ করে একত্ববাদের দ্বীনে পৌছালো তারা শেরেক থেকে মুক্তি পাবে, কারণ রসূলের আনুগত্য করলে সে আনুগত্য আল্লাহর হয় (নেসা-৮০)। এইজন্য সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে তার আনুগত্যকারীগণ শেরেক মুক্ত। আর যারা সম্যকগুরুকে রসূল বিশ্বাস করে তার সঙ্গ ধারণ না করে অনুপস্থিত রসূগণকে রসূল হিসাবে বিশ্বাস করে মারা গেল তখন তারা আফসোস করে করে নিজের হস্ত ধংশন করে বলবে, হায় আমরা যদি রসুলের সঙ্গ ধারণ করতাম তাহলে আজকে আমরা ক্ষতিগ্রস্থ হতাম না।(ফুরকান-২৭)। তাই রসূল ব্যতীত শেরেক মুক্তির কোন উপায় নেই।
আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম গুরু (৫৫ঃ৪)। আবার রসূলের একটি গুণবাচক নাম গুরু (২ঃ১৫১)। ইবলিশ আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫ঃ৩৬) (৩৮ঃ৭৯) এবং ইবলিশ আল্লাহ ও রসূলকে স্বীকার করে (২৪ঃ৪৭) কিন্তু ইবলিশ কখনও আল্লাহর কোন গুণবাচক নামে রসূলকে ডাকবে না। কেননা আল্লাহর কোন গুণবাচক নাম ধরে রসূলকে ডাকলে রসূলকে আল্লাহ বলার শামিল হয়ে যায়। ইবলিশ রসূলকে রসূল মানতে রাজি, কিন্তু রসূলকে আল্লাহ বলতে রাজী না, এইজন্য ইবলিশ কখনও গুরু নামে রসূলকে ডাকবে না বিধায় সে জয়গুরু বলেনা। যেহেতু আল্লাহর গুণবাচক নাম গুরু, এইজন্য গুরু নামে ইবলিশ কখনও রসূলকে ডাকে না। আবার রসূলের কোন গুণবাচক নামে ইবলিশ কখনও আল্লাহকেও ডাকে না। যেহেতু রসূলের গুণবাচক নাম গুরু আর গুরু নামে আল্লাহকে ডাকলে আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে ডাকা হয়ে যায়। অর্থাৎ রসূলথেকে আল্লাহকে পৃথক না করে আল্লাহকে ডাকা হয়ে যায়। আর ইবলিশতো রসূল থেকে আল্লাহকে পৃথক করে বা ঝবঢ়ধৎধঃব করেই কাফের (৪ঃ১৫০)। ইবলিশ আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্নভাবে ডাকতে গেলে রসূলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করা লাগে (৪৮১০)। রসূলের মধ্যে স্বয়ং আল্লাহ সক্রিয় আছেন এই বিশ্বাস করা লাগে (৮ঃ১৭)। রসূল যেখানে, আল্লাহ সেখানে আছেন এই বিশ্বাস করা লাগে (৫৭ঃ৪)। রসূল তথা মানুষের গর্দানের সাহা রগ থেকে আল্লাহ অতি নিকটে এই বিশ্বাস করা লাগে (৫০ঃ১৬)। রসূলের তথা মানুষের অতি নিকটে আল্লাহ এই বিশ্বাস করা লাগে (২ঃ১৮৫)। রসূল তথা মানুষকে আল্লাহ পরিবেষ্টন করিয়া আছেন এই বিশ্বাস করা লাগে (১৭ঃ৬০)। রসূল তথা সকল কিছুতেই আল্লাহ মোহিতুন ভাবে আছেন এই বিশ্বাস করা লাগে (৪ঃ১২৬))। উপরোক্ত আয়াতগুলি ইবলিশ এইজন্য অস্বীকার করে যে, উক্ত আয়াতগুলি বিশ্বাস করলে রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করা লাগে, আর ইবলিশ কখনও রসূল সুরতে আল্লাহ এইজন্য বিশ্বাস করবে না যে, রসূল সুরতে আল্লাহকে বিশ্বাস করলে আদম কাবায় আল্লাহকে সেজদা দেওয়া জরুরী হয়ে যায়। কিন্ত ইবলিশ কখনো আদম কাবায় সেজদার সামিল হবে না (১৫ঃ৩৩)। কারণ সেতো আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (২ঃ৩৪)। যেহেতু গুরু নামটি রসূলের একটি গুণ বাচক নাম (২ঃ১৫১) সেহেতু গুরু নামটি আল্লাহর গুণ বাচক নাম হওয়া সত্ত্বেও গুরু নামে ইবলিশ কখনও আল্লাহকে ডাকবে না বিধায় ইবলিশ জয়গুরু বলেনা। ইবলিশ গুরুনামে আল্লাহকে জয় না দেওয়ার আর একটি কারণ হচ্ছে এই যে, যদিও গুরু নামটি আল্লাহর গুণ বাচক নাম (৫৫ঃ৪) তথাপিও ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীরা গুরু নামটি আল্লাহর গুণ বাচক নাম হিসাবে বিশ্বাস করে না। যদিও গুরু নামটি রসূলের গুণ বাচক নাম (২ঃ১৫১) তথাপিও তারা রসূলকে গুরু বলে বিশ্বাস করে না, আর গুরু বলতে শুধু তারা একজন সাধারণ মানুষকে বুঝে। আর জয়গুরু বললে একজন মানুষের জয় বা প্রশংসা কামনার করা হয়। যেহেতু জয় বা প্রশংসার মালিক একমাত্র আল্লাহ (১ঃ১) সেহেতু শুধু জয়গুরু দিয়ে একজন সাধারণ মানুষের জয় কামনা করবে না। তাদের এহেন ভুল ধারণার কারণে ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীরা কখনও জয়গুরু বলবে না। পক্ষান্তরে তারাই জয়গুরু বলে, যারা আল্লাহকে গুরু বলে ডাকে, আর জয়গুরু দিয়ে তারা আল্লাহর জয় কামনা করে। কারণ গুরু তথা রসূল সুরতে আল্লাহ বিশ্বাস করে অর্থাৎ রসূলথেকে আল্লাহকে পৃথক বা ঝবঢ়ধৎধঃব না করেই আল্লাহ ও রসূলকে একাকার ও অবিচ্ছিন্ন ভাবে বিশ্বাস করে আদম কাবায় সেজদা করে থাকে। যেহেতু এই কাজটি ইবলিশ করেনা বিধায় ইবলিশ এবং ইবলিশের অনুসারীরা কখনও জয়গুরু বলে না। তাই এটা নিশ্চিত যে, যারা জয়গুরু বলেনা উহারাই ইবলিশের অনুসারী। আর আল্লাহ বলেন, তোমরা ইবলিশের অনুসরণ না করে পরিপূর্ণ ইসলামে দাখিল হয়ে যাও (২ঃ২০৮)।
এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমার রুহু মরিয়মের কাছে পাঠালাম, সে পূর্ণ মানব আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে মরিয়মের সাথে কথা বলেছে (১৯ঃ১৭)। এই আয়াতে প্রমাণ হয় আল্লাহর রুহু পূর্ণ মানব আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করেন। অনেকেই বলেন এই আয়াতে আমার রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হয়েছে। কথাটা ঠিক নহে, আমার রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো যাবে না। কেননা, এই আয়াতে আমার রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হলে এই পবিত্র কোরআনে যতগুলো আয়াতে আল্লাহ ‘আমার রুহু’ বলে উল্লেখ করেছেন ততগুলো আয়াতে আমার রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝতে হবে। সেক্ষেত্রে সুরা হিজর ২৯ নং আয়াত ও সূরা ছাদ এর ৭২ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, আমার রুহু আদমের ভিতরে প্রবিষ্ট করা হয়েছে। যদি আল্লাহর রুহু বলতে জিব্রাইলকে বুঝানো হয় তবে ঐ সময় আদমের ভিতরে জিব্রাইলকে প্রবিষ্ট করা হয়েছিল বলে প্রতিয়মান হয়। সেক্ষেত্রে আদম জিব্রাইল সংশ্লিষ্ট বলে প্রমাণ হয়। সে ক্ষেত্রে আদমকে সেজদার মাধ্যমে জিব্রাইলকে সেজদা করা হয়ে যায়, আর সে ক্ষেত্রে জিব্রাইল সেজদারযোগ্য হয়ে যায়। কিন্তু জিব্রাইল সেজদারযোগ্য নহ্ েএকমাত্র আল্লাহই সেজদার যোগ্য (জ্বীন-১৮)। কারণ সেজদার মালিক একমাত্র আল্লাহ। (সূরা হামিম-৩৭)। জিব্রাইল সেজদারযোগ্য এটা বিশ্বাস করা দ্বীনের পরিপন্থি বুঝ বলে গন্য হয়। কারণ পবিত্র কোরআনের মধ্যে একই শব্দের অর্থ বিভিন্ন যায়গায় ভিন্ন ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করলে তা কোরআনের প্রকৃত অর্থের পরিপন্থি বলে গন্য হয়। কাজেই সুরা মরিয়মের ১৭ নং আয়াতে উল্লেখিত ‘আমার রুহু’ বলতে জিব্রাইল কিংবা অন্য কোন ফেরেস্তাকে বুঝাইলে সেটা পবিত্র কোরআনের পরিপন্থি বলে গণ্য হয়। কাজেই উক্ত আয়াতে আমার রুহু বলতে আল্লাহর রুহু বুঝানো হয়েছে। আর মরিয়মের কাছে স্বয়ং আল্লাহর রূহু এসেছিল মরিয়মের গর্ভে ঈসা আ: কে সৃষ্টির উদ্দেশ্যে (১৯:১৭)। আল্লাহই স্বয়ং রূহু ফুৎকার করার মাধ্যমে ও কুন শব্দে মরিয়মের গর্ভে ঈসা আঃ সৃষ্টি করেছিলেন। (সূরা তাহরীম-১২, ইমরান-৫৯) মরিয়ম-৩৫। এই মর্মে আল্লাহ বলেন অতঃপর মরিয়মের মধ্যে আমি আমার রূহু ফুৎকার করিয়া দিলাম (২১:৯১)। যদি মরিয়মের কাছে জিব্রাইল আসত আর জিব্রাইল কুন শব্দে এবং রূহু ফুৎকারের মাধ্যমে ঈসা আ: সৃষ্টিক করেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। সেক্ষেত্রে জিব্রাইল সৃষ্টিকর্তা বলে গন্য হয়। কিংবা কুন শব্দ বলার মালিক জিব্রাইল হয়ে যায়। কিংবা জিব্রাইল ঈসা (আ:) সৃষ্টির মাধ্যমে বলে গণ্য হয় সেক্ষেত্রে জীব্রাইল ঈসা (আ:) পিতা বলে গণ্য হয়। কিন্তু না, জিব্রাইল ঈসা (আ:) পিতা নহে বরং কোন মাধ্যম ছাড়াই স্বয়ং আল্লাহ নিজেই ঈসা আ: কে সৃষ্টি করেছেন। কারন জিব্রাইল রূহু ফুৎকার করার মাধ্যমে কিংবা কুন শব্দ বলার মাধ্যমে কোন কিছু সৃষ্টি করার মালিক নহে। বরং ঈসা আ:-কে সৃষ্টি করার সময় স্বয়ং আল্লাহর রূহ এসেছিল মরিয়মের সাথে মানব আকৃতির ছদ্মবেশ ধারন করে এটা নিশ্চিত। এই জন্য আল্লাহ বলেন পবিত্র আত্মা দ্বারা ঈসা (আঃ)কে আমি শক্তিশালী করিয়াছি (২ঃ৮৭) (৫ঃ১১০)। এই আয়াতে রুহুল কুদ্দুস বলতে পবিত্র আত্মা তথা আল্লাহর রুহুকে বুঝানো হয়েছে। আর তাই সূরা মরিয়মের ১৭ নং আয়াতে ‘আমার রুহু’ বলতে কোন অবস্থায় জিব্রাইলকে বুঝানো যাবে না। যদি কেহ এমনটা বুঝেন সেটা কুরআনের পরিপন্থি বলে গণ্য হবে। আর কুরআনের পরিপন্থি বুঝ গ্রহণযোগ্য নয় বিধায় উক্ত আয়াতে ‘আমার রুহু’ বলতে কোন অবস্থায় জিব্রাইলকে বুঝানো যাবে না।
অনেকেই বলেন, নবী (সঃ) আল্লাহর দর্শন লাভ করে নি। কথাটা ঠিক নহে, কারণ নবী (সঃ) আল্লাহর দর্শন লাভ করেছেন সূরা নজমের ১ থেকে ১৮ নং আয়াতে তা উল্লেখ আছে। এই সকল আয়াতে নবী (সঃ) যে স্বয়ং আল্লাহকেই দেখেছেন এই মর্মে ইবনে আব্বাস (রাঃ) এবং ইবনে আনাস (রাঃ) এর তফছিরে মাজহারিতে উল্লেখ আছে। সৌদি আরব থেকে প্রেরিত মা-আরেফুল কোরআনের সংক্ষিপ্ত তফছিরের ১৩০৩ পৃষ্ঠায় তা উল্লেখ করা হয়েছে। তাছাড়া সূরা নজমের ৫ নং আয়াতে বলা হয়েছে, সাদিদুল কুয়াই’ অর্থাৎ প্রকৃত শক্তিশালী, সহজাত শক্তিসম্পন্ন, সৃষ্টিগত শাক্তিশালী বলতে একমাত্র আল্লাহকেই বুঝতে হবে। কারণ ‘সাদিদুল কুয়াই’ শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকৃত শক্তিশালী। কারণ ‘কুয়াই’ শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রকৃত শক্তিশালী। (আরবী অভি. পৃ. নং- ২০০৮)। সূরা নজমের ৬ নং আয়াতে উল্লেখ আসছে যে, যিনি শক্তির মালিক অতঃপর তিনি তার নিকট প্রকাশিত হলেন, তার অনুরূপ আকৃতিতে। এখানে আয়াতে এসেছে ‘যু-মিররাতিন ফা-ইস্তাওয়াই’ অর্থাৎ ‘যু’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে মালিক (আরবী অভি. পৃ. নং- ১৩২৯) আর ‘মিররাতিন’ শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে শক্তি (আরবী অভি. পৃ. নং- ২২২৭) আর ফা- শব্দের অর্থ অতঃপর। যা এই আয়াতের মূল শব্দ ‘ইস্তাওয়াই’ শব্দের সাথে যোগ হয়েছে। এখন ‘ইস্তাওয়াই’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, বরাবর বা অনুরূপ (আরবী অভি. পৃ. নং- ২৭৮)। তাহলে এই আয়াতের প্রকৃত অর্থ দাড়ালো- যিনি শক্তির মালিক, অতঃপর তিনি তাঁর (নবী (সঃ) এর) নিজ আকৃতিতে বা অনুরূপ আকৃতিতে প্রকাশিত হয়েছে (৫৩ঃ৬)। অতঃপর নিকটবর্তী হইলেন (৫৩ঃ৭)। অতি নিকটে অর্থাৎ দুই ধনুকের ব্যবধান (৫৩ঃ৮)। অতঃপর তার প্রভু যাহা ওহি করার তা করিলেন (৫৩ঃ৯)। উপরোক্ত আয়াতগুলিতে প্রমাণ হয় যে, আল্লাহ নবী (স.)-এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে দেখা দিয়েছেন। এখানে একটি প্রশ্ন থেকে যায় যে, অনেকেই বলেন, এই আয়াতে নিজ আকৃতি বলতে আল্লাহর নিজ আকৃতি বুঝানো হয়েছে, কিন্তু কথাটি ঠিক নহে, এই আয়াতে আল্লাহ অন্য রূপের ছদ্মবেশ ধারণ ব্যতিত যদি স্বয়ং নিজ আকৃতি ধারণ করে নবী (স) এর সাথে সরাসরি কথা বলতেন বা দেখা দিতেন তাহলে সুরা শুরার ৫১ নং আয়াতের পরিপন্থি বলে গন্য হয় কিংবা উক্ত আয়াতটি ব্যর্থ হয়। কোরআনের এক আয়াত আরেক আয়াতের পরিপন্থি নয় বিধায় আল্লাহ নিজ আকৃতিতে কথা বলেছেন, কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়। বরং মোহাম্মদ (স) এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলেছেন বা দেখা দিয়েছেন এটা গ্রহণযোগ্য। কারণ সুরা শুরার ৫১ নং আয়াতে হিযাব ধারণ বা ছদ্মবেশ ধারণ কথাটা উল্লেখ আসছে। অনেকেই বলেন, এই আয়াতে জিব্রাইল তার নিজ আকৃতিতে মুহাম্মদ (স) এর সাথে দেখা দিয়েছে। তাদের কথাটি ঠিক নয়, কারণ এই আয়াতে উল্লেখ আসছে যিনি শক্তির মালিক, অর্থাৎ সৃষ্টিগত শক্তিশালী এবং সহজাত শক্তিসম্পন্ন তিনি মুহাম্মদ (স) এর সাথে দেখা দিয়েছেন। আর যদি সেক্ষেত্রে আমরা তাকে জিব্রাইল বলে আখ্যায়িত করি, তাহলে জিব্রাইল শক্তির মালিক, অর্থাৎ সৃষ্টিগত শক্তিশালী এবং সহজাত শক্তিসম্পন্ন বলে গন্য হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে জিব্রাইল আল্লাহর শরিক বলে গণ্য হয়। এটা পবিত্র কোরআনের পরিপন্থি বিধায় এটা গ্রহনযোগ্য নয়। কারণ শক্তির মালিক একমাত্র আল্লাহ (২ঃ১৬৫)। কোন কিছুতেই আল্লাহর সমকক্ষ কেউ নেই (২ঃ১৬৫)। এতে প্রমাণ হয় যে, মুহাম্মদ (স) নিজ আকৃতিতে স্বয়ং আল্লাহকেই দেখেছেন, এতে কোন সন্দেহ নেই। কারণ নবীদের সুরতের ছদ্মবেশ ধারণ করেই আল্লাহ নবীদের সাথে কথা বলেন এইজন্য যে, নবীদের সুরতের ছদ্মবেশ ইবলিশ ধারণ করতে সক্ষম নয়। কারণ প্রত্যেক নবীই নিজের চেহারায় সেজদাকারী (৭ঃ২৯)। যেহেতু নবীগণ তাদের নিজের চেহারায় সেজদাকারী, সেহেতু তারা আদম কাবায় সেজদাকারী বলে গণ্য। ফলে ইবলিশ নবীদের চেহারার ছদ্মবেশ ধারণ করে না এই জন্য যে, ইবলিশ আদম কাবায় সেজদাকারীদের শামিল হবে না (১৫ঃ৩৩)। ইবলিশ আদম কাবায় সেজদা না দিয়েই কাফের (২ঃ৩৪)। আর এইভাবে নিজের চেহারায় সেজদার মাধ্যমেই আদম নিজেকে ইবলিশমুক্ত করেছিলেন। আর তাই ওহিকে আল্লাহ ইবলিশ থেকে হেফাজত করার লক্ষ্যেই নবীগণের নিজের চেহারার ছদ্মবেশ ধারণ করে কথা বলে থাকেন। আর এইভাবে আল্লাহ ওহিকে ইবলিশ থেকে হেফাজত করেন (হিজর-৯ ও ১৭)। উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর দর্শন বা সাক্ষাৎ লাভ করেছেন। অতএব নবী (স) আল্লাহর দর্শনে ব্শ্বিাসী ছিলেন এটা নিশ্চিত। যারা আল্লাহর দর্শনে বিশ্বাসী নয় তারা আল্লাহর দর্শনে বিশ্বাসীর বিষয়ে নবী (স) এর অনুসারী নয়। এই জন্য যে, আল্লাহ বলেন, দ্বীন সংক্রান্ত সকল বিষয়ে নবী (সঃ)কে অনুসরণ কর। তাহলে আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করবেন। (৩ঃ৩১)।
অনেকেই বলে ওহীর সাথে রসুলের সম্পর্ক। প্রত্যেক রসূলের উপর ওহী নাযিল হয়েছে। ওহী যখন শেষ রসূলও শেষ, তাদের এই কথা ঠিক নহে, কারণ প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত নহে। বরং প্রত্যেক নবী ওহী প্রাপ্ত। কারণ প্রত্যেক নবীই কিতাব প্রাপ্ত (ইমরান ঃ ৮১) আর ওহী ব্যতিত কোন কিতাব হতে পারে না বিধায় প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত এটা নিশ্চিত। আল্লাহ বলেন, আমি নবীদের উপরে ওহী নাযিল করি (সূরা নেসাঃ ১৬৩)। কারণ আল্লাহ নবীদের নবুয়ত দিয়েছেন বিধায় তারা নবী। আর নবীদের কে নবুয়ত দান করেছেন (ইমরান-৭৯)। তাহলে দেখা গেল প্রত্যেক নবীই নবুয়ত প্রাপ্ত ওহী প্রাপ্ত ও কিতাব প্রাপ্ত। আর নবীদের কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়ত, ওহী এবং কিতাব পৌছানের পরে তাকে আবার রিসালাত দেওয়া হইল (সূরা জ্বীন- ২৩)। যাকে নবুয়ত দেওয়া হয় তিনি নবী। তাহলে দেখা গেল ওহীর সাথে নবীর সম্পর্ক। ওহী শেষ বিধায় নবীও শেষ (আহয়াব-৪০)। ওহীর সাথে সকল রসূলের সম্পর্ক নাও থাকতে পারে। রসূলের কাজ হচ্ছে ওহী প্রচার করা (মায়েদা-৯৯)। প্রচার কাজ শেষ হবে না বিধায় রসূল শেষ এমন আয়াত আসে নাই। কাজেই ওহী শেষ রসূল শেষ এমন কথার কোন ভিত্তি নেই। এখানে উল্লেখ যে, আর যাকে রিসালাত দেওয়া হয় তিনি রসূল প্রত্যেক নবীই রিসালত প্রাপ্ত (৭২ঃ২৩)। তাহলে দেখা গেল প্রত্যেক নবীই রসূল। কারণ প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত রিসালত প্রাপ্ত। আর তাই নবীদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। (বাকারা- ১৩৬) তাহলে দেখা গেল নবীদের উপর দুইটি পদ, একটি হচ্ছে নবী পদ, অপরটি হচ্ছে রসূল পদ। তবে নবী পদটা হস্তান্তযোগ্য নহে। পক্ষান্তরে রসূল পদটা হস্তান্তরযাগ্য (সূরা আনআম- ১২৪)। তাই প্রত্যেক নবীই তার শেষাংশে তাঁর বিশ্বস্থ এবং ঘনিষ্ট একজনকে রিসালত দিয়ে রসূল হিসাবে রেখে যাবেন। এই মর্মে নবীদের কাছ থেকে আল্লাহ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন তোমার কাছে যখন একজন রসূল আসবে তখন তুমি তাদেরকে বিশ্বাস করবে ও সাহায্য করবে (ইমরান-৮১)। এই আয়াত অনুসারে নবীর পরেই একজন রসূল থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ নবীর কাছে যে রসূল পদটা সংরক্ষিত ছিল এটা তিনি হস্তান্তর করে রসূল রেখে গেলেন। এই রসূল কিন্তু নবী নহেন। কারণ নবী পদটি হস্তান্তরযোগ্য নহে বিধায় যাকে রিসালত দিয়ে সাহায্য করে রসূল হিসাবে রেখে গেলেন তার উপর নবুয়ত পদ নেই। এই রসূলগণ পরবর্তী নবী আসা পর্যন্ত অর্থাৎ দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়তে দায়িত্ব পালন করেন (মায়েদা-১৯)। কিংবা নবী যখন শেষ তখনও ঐ রসূলগণ দায়িত্ব পালন করবেন। এইভাবে পর্যায়ক্রমে রসূলের ধারা অব্যাহত আছে। (বাকারা-৮৭) এবং এইভাবে একের পর এক বিরতিহীন ভাবে রসূল চলবে। (মমিন-৪৪)। এখানে উল্লেখ্য যে, নবীগণ রসূল, এই রসূলগণ ওহী প্রাপ্ত (মায়েদা-৬৭)। কারণ এই রসূলগণ আল্লাহর কাছ থেকে সাহায্য প্রাপ্ত অর্থাৎ রিসালত প্রাপ্ত (সূরা জ্বীন- ২৩)। পক্ষান্তরে আর এক শ্রেণির রসূল আছেন, যে সকল রসূলগণ নবীর কাছ থেকে রিসালত প্রাপ্ত অর্থাৎ সাহায্য প্রাপ্ত (ইমরান-৮১)। এরা কিন্তু ওহী প্রাপ্ত রসূল নহেন। এরা নবী নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল যারা নবী নহে (হজ্ব-৫২)? কারণ ইহাদের প্রতি ছিল না কোন ওহী। যেহেতু প্রত্যেক নবীই কিতাব প্রাপ্ত (ইমরান ৮১)। যেহেতু এই রসূলগণের প্রতি কোন ওহী ছিল না বিধায় এরা নবী নহে। এরা ছিল ওহী ব্যতীত রসূল। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, ওয়া মা আর সালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসূলি ইল্লা ‘নু’ ‘ওহী’ ইলাইহি, আন্নাহু লা ইলাহা ইল্লা আনা ফা তাবুদুনা। অর্থ ঃ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল যাদের প্রতি ছিল না কোন ওহী। নিশ্চয় উহারা শুধু এই কথায় প্রচার করিত যে, “আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই। অতএব তোমরা আমারই ইবাদত কর” (২১ ঃ ২৫)। আল্লাহ বলেন, ওয়া মা আরছালনা মিন কাবলিকা মিনার রসুলি ইল্লা-নু ওহীই ইলাইহি আন্নাহু লা-ইলাহা ইল্লা আনা ফা তাবুদুনা (২১ ঃ ২৫)। এখানে মা শব্দের অর্থ না সূচক অথবা প্রশ্নবোধক (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ২১৯৩) আরছালনা অর্থ আমি পাঠিয়েছি (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ১৫২) কাবলিকা অর্থ তোমার পূর্বে (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ১৯১৮) মিনার রসুলি - রসূলদের মধ্য হইতে। আন্না অর্থ নিশ্চয়তাবোধক অব্যয়, যাহা দুই বাক্যের মাঝখানে বসে, তার পরবর্তী খবরকে পেশ দেয়। (আ ঃ অভিঃ পৃঃ নং ৫১৬)। হু একটি সর্বনাম, যার অর্থ তিনি বা সে (আঃ দিশারী অভিঃ ১৯৪)। আর এই আয়াতে পূর্বের বাক্যে উল্লেখিত রসুলকে বোঝানো হইয়াছে। অর্থাৎ আন্নাহু শব্দটা দুই বাক্যের মাঝখানে বসে দুটি বাক্যকে আলাদা রেখে অর্থ করে, যেমন সুরা বাকারার ২৬ নং আয়াত এবং ৬৮ ও ৬৯ নং আয়াত আন্না শব্দ এই ভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে। সেই অনুসারে এখানে এই আয়াতের আন্না শব্দ দিয়ে আয়াতের প্রথম অংশ, (আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল, যাদের প্রতি ছিলনা কোন ওহী।) এই অংশটিকে ২য় অংশ থেকে (আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই। অতএব তোমরা আমার ইবাদত কর) আলাদা করা হয়েছে। অনেকেই এই আয়াতটিকে প্রত্যেক নবীর উপর একটি কমন ওহী এসেছে এই অর্থে ব্যবহার করে। তাদের উদ্দেশ্য ঠিক নহে। কারণ প্রত্যেক নবীর উপর একটি কমন ওহী এসেছে এটা প্রকাশ করাই যদি এই আয়াতের উদ্দেশ্য হইত তাহলে আয়াতটিতে রসূল শব্দ না এসে নবী শব্দ আসতো। কারণ প্রত্যেক নবীই কিতাবপ্রাপ্ত (ইমরান ৮১)। আর নীবদের উপরতো ওহী নাযিল হয়েছে (সুরা নেসা ১৬৩)। যেহেতু সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে নবী শব্দ না এসে রসূল এসেছে বিধায় প্রমাণিত হয় যে, উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য কমন ওহী ব্যক্ত করা নহে এটা নিশ্চিত। উক্ত আয়াতটিকে কমন ওহীর আয়াত হিসেবে অর্থ না করার দ্বিতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, যদি আয়াতটিকে কমন ওহীর দিকে অর্থ করা হয়, তাহলে প্রমাণ হয় যে, ওহী ব্যতীত কোন রসূল নেই। সে ক্ষেত্রে উক্ত আয়াতটি, সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতের পরিপন্থি হয়। কারণ এই আয়াতের বলা হয়েছে দুই নবীর মধ্যবর্তী ফাতারাতি পিরিয়ডে যখন ওহী বিরতি ছিল তখনও রসূল ছিল। এরা ছিল ওহী ব্যতীত রসূল। কারণ ঈসা (আ.) এর পর থেকেই মোহাম্মদ (সা.) এর পূর্ব পর্যন্ত এই পাঁচশত বৎসর কোন ওহী ছিল না। অথচ এখানে রসূল ছিল। এটাই সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতে ইঙ্গিত আসছে। কাজেই যদি কেহ সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটি এমনভাবে অর্থ করে যে, ওহী ব্যতীত কোন রসূল ছিল না। সেক্ষেত্রে উক্ত আয়াতের সাথে সূরা মায়েদার ১৯নং আয়াতের বিরোধ হবে বিধায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটিকে কমন ওহীর দিকে অর্থ না করে বরং আয়াতের প্রকৃত যে উদ্দেশ্য, তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল পাঠিয়েছি যারা ওহী ব্যতীত রসূল। তাহলে উক্ত আয়াতটি পবিত্র কোরানের কোন আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধী হবে না এটা নিশ্চিত। তাছাড়াও উক্ত আয়াতটি কমন ওহীর দিকে অর্থ না করার তৃতীয় কারণ হচ্ছে এই যে, পূর্বে নাযিলকৃত ওহীকে বিশ্বাস করতে বলা হয়েছে (সূরা বাকারায় আয়াত নং-৪)। বিধায় একই ওহী বারবার কিংবা প্রত্যেক নবীর কাছে নাযিল হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না বরং একই ওহী প্রত্যেক রসূল প্রচার করতে পারবে এতে কোন সন্দেহ নেই বিধায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে যে সকল রসূলের কাছে কোন ওহী নাযিল হয়নি তাহারা পূর্বে নাযিলকৃত ওহীগুলিকে বিশ্বাস করে বারবার প্রচার করেছে তাহাই বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে পূর্বে নাযিলকৃত ওহী, ‘আমি ছাড়া কোন ইলাহা নেই অতএব তোমরা আমার ইবাদত করো’ সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতের অর্থ এটাই। তার পরেও সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে কমন ওহির দিকে অর্থ না করার প্রকৃত কারণ হচ্ছে এই যে, আরবী ব্যাকরণ থেকে জানা যায় বিশেষ্যের আগে ما (মা) শব্দ আসলে অর্থ হয় কী? যেমন مااسمك তোমার নাম কী? আর যখন একই বাক্যে ما (মা) এবং الا )ইল্লা) শব্দ আসে তখন সেটা না সূচক প্রশ্নবোধক হয়। এই ধরণের م (মা) কে م وصله মা-মাওচুলা বলে। যেমন ওয়া মা মুহাম্মাদিন ইল্লা রাসুলান। অর্থ মুহাম্মদ কী রসূল ব্যতীত নহে? (সুরা ইমরান ১৪৪) ওয়া মা আরসালনাকা ইল্লা রাহমাতাল্লিল আলামিন। অর্থ আমি কি তোমাকে পাঠাইনি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ অন্যকে ব্যতিত? (আম্বিয়া-১০৭)। এই আয়াতে মা এবং ইল্লা শব্দ এসেছে বিধায় বাক্যের প্রথম অংশে না সূচক প্রশ্নবোধক অর্থ ব্যবহৃত হবে এবং পরের অংশে ইল্লা শব্দের অর্থ বহাল রেখে যে অর্থ আসে সে অর্থে আয়াতটিকে অর্থ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আয়াতটির সরল অর্থ হয় আমি একমাত্র তোমাকে পাঠিয়েছি জগতের জন্য রহমত স্বরূপ। যেমন উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, আমি কি তোমার কাছে পাঠাইনি ছাত্রদের মধ্য থেকে এমন অনেক ছাত্র যারা ছিল কিতাব ব্যতিত? এক্ষেত্রে যেভাবেই অর্থ করি না কেন, এর প্রকৃত অর্থটা হবে এরকম-তোমার কাছে কিতাব ব্যতিত কিছু ছাত্র পাঠিয়েছি, এর বাইরে অর্থ করলে বাক্যের অর্থ বিপরীত হবে। সেক্ষেত্রে যদি কেহ প্রথম অংশের প্রশ্নবোধকটা উঠিয়ে দিয়ে অর্থ করে তখন অর্থ কিন্তু পরিবর্তন হয়ে বিপরীত দিকে চলে যায়। যেমন আমি তোমার কাছে কিতাব ব্যতিত কোন ছাত্র পাঠাইনি। বা আমি পাঠাইনি কোন ছাত্র কিতাব ব্যতিত। এখানে প্রশ্নবোধক শব্দ উঠিয়ে দেওয়ায় বাক্যের অর্থ বিপরীত হয়ে গেল। যেহেতু চিঠিতে প্রশ্নবোধক এসেছে আর সেক্ষেত্রে প্রশ্নবোধক বাদ দিলে যদি প্রকৃত অর্থ বিপরীত দিকে হয় তাহলে কোন অবস্থায় উক্ত বাক্যে প্রশ্নবোধক শব্দ বাদ দেওয়া যাবে না। ঠিক তদ্রুপ সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে এসেছে ‘ওযা মা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি ইল্লা নু ওহি ইলাইহি। অর্থ আমি কি পাঠাইনি, তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূলকে, যারা ছিল ওহি ব্যতিত? এখন যদি কেহ প্রশ্নবোধকটা উঠিয়ে দেয় তাহলে অর্থটা এর বিপরীত হবে। যেমন আমি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন রসূল যারা ছিল ওহি ব্যতিত। তাহলে কিন্তু আল্লার কথার বিপরীত অর্থ হবে। আর সেক্ষেত্রে আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হলে তার জন্য কঠিন শাস্তি (সূরা হজ্ব-৫১)। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে প্রশ্নবোধক রেখেই অর্থ করতে হবে। সেক্ষেত্রে আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে না। তাই আয়াতটির প্রকৃত অর্থ হবে ‘আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূলকে যারা ছিল ওহি ব্যতিত’। অর্থাৎ ওহি ব্যতিতও অনেক রসূল ছিল। আরেকটি আয়াত যেমন সূরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতে এসেছেÑওমা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি লা নাবি ইল্লা ইজা তামান্নাই। ...অর্থ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূল যারা নবী নহে। উক্ত দুই আয়াতে প্রশ্নবোধক শব্দ বাদ দিয়ে কোন অর্থ গ্রহণযোগ্য নহে। কারণ ওমা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনার রাসুলি শব্দ দিয়ে রসূলদের মধ্যে দুই ধরণের রসূলের কথা বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ রসূলদের মধ্যে পার্থক্য আছে (সুরা বাকারা-২৫৩)। পবিত্র কোরআনে এমন কোন আয়াত নেই যে, মা আরসালনা মিন কাবলিকা মিনান নাবীই। অর্থাৎ আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে নবীদের মধ্য থেকে এমন অনেক নবী? নবীদের মধ্য থেকে এমন অনেক নবী আছে, এমন কথা কোরআনে আসে নাই। কারণ নবীদের ভিতরে কোন পার্থক্য নাই (বাকারা-১৩৬)। সকল নবীই ওহি প্রাপ্ত বা কিতাব প্রাপ্ত। (ইমরান-৮১) (নেসা-১৬৩)। পক্ষান্তরে রসূলদের মধ্য থেকে এমন অনেক রসূল কথা কোরআনে আসছে। এতে প্রমাণ হয় রসূল দুই ধরনের। এক ধরনের রসূল ওহি প্রাপ্ত (মায়েদা-৬৭) আর অপর রসূল ওহি ব্যতীত (আম্বিয়া-২৫)। আর এই দুই ধরনের রসূলের মধ্য থেকে ওহি প্রাপ্ত রসুলের নাম কোরআনে এসেছে, আর ওহি ব্যতিত রসুলের নাম কোরআনে আসে নাই। (নেসা-১৬৪)। কাজেই উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটিকে কমন ওহির আয়াত হিসাবে অর্থ করা যাবে না কিংবা ওহি ব্যতিত কোন রসূল নেই এমন ভাবে অর্থ করা যাবে না। করলে সেটা অন্য আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধী হবে বিধায় উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে। তাছাড়া যদি কেহ উক্ত আয়াতের অর্থ অন্যভাবে করে আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি হল জাহান্নাম (সূরা হজ্ব ৫১)। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটিকে কমন ওহী নাযিলের দিকে অর্থ করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম। কাজেই সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটির প্রকৃত উদ্দেশ্য ওহী ব্যতীত অনেক রসূল ছিল। আর সম্যকগুরুগণই হচ্ছে ওহী ব্যতীত রসূল। অনেকে আছে যারা ওহীপ্রাপ্ত রসূলগণকে বিশ্বাস করে আর ওহী ব্যতীত রসূলগণকে অস্বীকার করে। এদের উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেন উহারা কতক রসূলকে বিশ্বাস করে আর কতক রসূলকে অস্বীকার করেন। উহারা এই বিষয়ের মধ্যে একটা মধ্যবর্তী পথ অবলম্বন করতে চায় (সূরা নেসা ১৫০)। মূলত উহারাও কাফের বলে গণ্য হয় (সূরা নেসা ১৫১)। উপরোক্ত আলোচনায় প্রমাণিত হয় যে, রসূল হচ্ছে দুই প্রকার। একটা হচ্ছে ওহীপ্রাপ্ত রসূল আর অপরটি হচ্ছে ওহী ব্যতীত রসূল। এইজন্য রসূলের মধ্যে পার্থক্য আছে (বাকারা- ২৫৩)। আর সেই পার্থক্যটা হচ্ছে এই যে, একটি হচ্ছে ওহীপ্রাপ্ত রসূল (মায়েদা-৬৭) অপরটি হচ্ছে ওহী ব্যতিত রসূল (ইমরান-৮১) (সূরা আম্বিয়া-২৫)। যে রসূলটা নবীর কাছ থেকে রেসালতের মাধ্যমে আসছে। (ইমরান-৮১)। তিনি ওহী ব্যতীত রসূল। এখানে উল্লেখ্য যে, আল্লাহ যখন সরাসরি নবীর কাছে ওহী নাযিল করেন তখন তিনি শয়তান থেকে ওহীকে নিজে হেফাজত করে থাকেন (সূরা হিযর-১৭)। কিন্তু যে সকল রসূল, নবী নহেন, নবীর কাছ থেকে রিসালত প্রাপ্ত। সেই সকল রসূলগণ, সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াত অনুসারে পূর্বের নবী এবং রসূলগণের কিতাবের আয়াত প্রচার করতে গেলে তখন শয়তান তাদের অন্তরে কিছু প্রক্ষিপ্ত করে আল্লাহর আয়াতকে ব্যর্থ করার জন্য কিন্তু আল্লাহ নিজেই তখন তাদের অন্তর থেকে তাহা বিদুরিত করে দিয়ে আল্লাহর আয়াতকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেন। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, আমি কি পাঠাইনি তোমার পূর্বে এমন অনেক রসূল, যারা নবী নহে, উহারা যখন (পুর্বে নবীদের কিতাব থেকে আয়াত প্রচারের) আকাঙ্খা করিত, তখন শয়তান তাদের অন্তরে কিছু প্রক্ষিপ্ত করিত, তখন শয়তান তাদের অন্তরে যাহা প্রক্ষিপ্ত করিয়াছিল, আল্লাহ তাহা বিদুরিত করিয়া আল্লাহর আয়াতকে সু-প্রতিষ্ঠিত রাখে। আল্লাহ প্রজ্ঞাময় এবং সর্বজ্ঞ। (হজ্ব-৫২)। এখানে উল্লেখ্য যে, যারা রসূল নহে এমনসব লোক যখন কোরআন প্রচার করতে যায়, তখনই তাদের অন্তরে শয়তান কিছু প্রক্ষিপ্ত করে মানুষের মধ্যে আল্লাহর আয়াত সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরী করে। তখনই কুরআনের এক আয়াতের অনুবাদ অন্য আয়াতের অনুবাদের সহিত পরিপন্থী হয়ে যায়। কিন্তু জেনে রাখবেন, কুরআনের মধ্যে পরস্পর বিরোধী কোন আয়াত নেই। এই জন্য কুরআন শিক্ষার জন্য আল্লাহ বলেন, রাসূল তোমাদিগকে কুরআন শিক্ষা দিবেন। (সূরা বাকারা-১৫১) (সূরা ইমরান-১৬৪)। এজন্য আল্লাহ বলেন, প্রত্যেক গ্রামে বা জনপদে আমার আয়াত আবৃত্তি করার জন্য রসূল পাঠাই (কাসাস-৫৯)। অনেকেই বলেন, প্রত্যেক রাসূলই কিতাবপ্রাপ্ত। যাহা উপরোক্ত আলোচনার পরিপন্থী কথা। এই মর্মে তারা পবিত্র কুরআনের সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতটি এই ভাবে অর্থ করে যে, তোমার পূর্বে যে সকল রাসূল পাঠিয়েছি তারা সকলেই ওহীপ্রাপ্ত। কিন্তু না, এই আয়াতে এ কথা বলা হয় নাই (বি: দ্র: পূর্বে এই আয়াতের শব্দ বিশ্লেষণ করা হয়েছে সেখানে বিস্তারিত কেধুন) প্রত্যেক রাসূল ওহী প্রাপ্ত নহে। প্রত্যেক রসূল ওহীপ্রাপ্ত, এই আয়াতে এটা বলা হয়নি, কারণ এমনটি বললে এই আয়াতটি অর্থাৎ (২১ : ২৫) আয়াতটি সূরা ইমরানের ৮১নং আয়াতের এবং সূরা হজ্বের ৫২নং আয়াতের সাথে পরস্পর বিরোধি বলে গণ্য হয়। কারণ প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত হলে প্রত্যেক রসূল কিতাব প্রাপ্ত হতো। কিন্তু আয়াতে বলেছে, প্রত্যেক নবী কিতাব প্রাপ্ত। (সুরা ইমরান ৮১) আর ওহী কিতাবের অংশ, ওহী ব্যতিত কোন কিতাব নেই। বিধায় এই আয়াত অনুসারে প্রত্যেক নবী ওহী প্রাপ্ত। যারা ওহী প্রাপ্ত তাদের কথা বলাই যদি সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে উদ্দেশ্য হতো, তাহলে আয়াতটিতে বলা হতো, তোমার পূর্বে আমি ওহী ব্যতীত কোন নবী প্রেরণ করি নাই। কিংবা তোমার পূর্বে আমি যেসকল নবী পাঠিয়েছি তারা সকলে ওহী প্রাপ্ত। তাহলে সূরা ইমরানের ৮১নং আয়াতের সাথে সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতটি পরস্পর বিরোধী হইত না। যেহেতু সূরা আম্বিয়ার ২৫ নং আয়াতে নবীর কথা আসে নাই। বরং রাসূল শব্দ এসেছে, তাহলে উক্ত আয়াতের উদ্দেশ্য হচ্ছে তোমার পূর্বে ওহী ব্যতীত অনেক রসূল ছিল এই কথা ব্যক্ত করেন। এখানে উল্লেখ যে, নবী মোহাম্মদ (স:) এর পূর্বে এবং ঈসা (আ:)-এর পরে অর্থাৎ ঈসা (আ:) এর পরে মোহাম্মদ (স:) এর পূর্বে মাঝখানে এই ৫০০ বৎসর এখানে কোন ওহী ছিল না। অথচ এখানে রসুল ছিল (সূরা মায়েদা-১৯)। আর সেই রসুলগণ ছিল ওহী ব্যতিত রসুল। আর এই ধরনের রসূলগণের নাম কিতাবে উল্লেখ আসে নাই (সুরা নেসা-১৬৪)। আর এই রসূলদের কথায় সূরা আম্বিয়ার ২৫নং আয়াতে বলা হয়েছে। নবীর কাজ ওহী প্রচার করা এমন আয়াত আসে নাই, বরং আয়াতে আসছে রসূলের কাজ হচ্ছে ওহী প্রচার করা। (মায়েদা-৯৯), (মায়েদা-৬৭)। তারপরও যদি কেহ মায়েদার ৬৭ আয়াত দিয়ে প্রমান করতে চায় যে, প্রত্যেক নবীর উপর যেমন ওহী নাযিল হয়েছে তেমনই প্রত্যেক রসূলের উপরও ওহী নাযিল হয়েছে। অর্থাৎ যদি তারা এমনটি বলে যে, প্রত্যেক নবীই ওহী প্রাপ্ত এবং প্রত্যেক রসূল ওহী প্রাপ্ত। অর্থাৎ নবী ও রসূল শব্দটি শুধু ওহীর সাথে সম্পৃক্ত। তাদের কথায় প্রমাণ হয় যে, নবী এবং রসূলের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। নবী ও রসূল একই ব্যক্তি এক পদ, যেটা ওহীর সাথে সর্ম্পক্যযুক্ত। তাদের কথা ঠিক নহে এই জন্য যে, নবী ও রসূল এক পদ নয়। প্রত্যেক নবীই কিতাবপ্রাপ্ত বা অহীপ্রাপ্ত (সূরা ইমরান-৮১)। কিন্তু প্রত্যেক রসুল কিতাবপ্রাপ্ত নহে বিধায় প্রত্যেক রসূল নবী নহে। এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমার পূর্বে আমি কি এমন অনেক রসুল পাঠাইনি যারা নবী নহে (সূরা হজ্জ্ব-৫২)? অর্থাৎ যাহাদের উপর অহী নাযিল হয়নি তাহারা নবী নহে বিধায় প্রত্যেক রসুল অহীপ্রাপ্ত নহে এটা নিশ্চিত। আবার নবী ও রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে। কারণ নবী ও রসূল একই ব্যক্তি নাও হতে পারে। এটাই বড় পার্থক্য। মর্যাদাগত বা গুণগত পার্থক্যের বিষয়টি এই পুস্তকের ‘নবী ও রসূল এর মধ্যে পার্থক্য’ অধ্যায়ে বিস্তারিত দেখুন। এখানে আমি একটা বিষয়ে বলতে চাই, নবী ও রসূল যখন আলাদা ব্যক্তি তখন নবী ও রসূল এর ভিতরে পার্থক্য আছে প্রমাণিত হয়। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, হে নবী তোমার কাছে যখন একজন রসূল আসবে (ইমরান-৮১) এই আয়াতে অবশ্যই প্রমাণিত হয় যে, নবীর কাছে যে রসূল আসবেন তিনি নিশ্চয়ই নবী নহে, তিনি শুধু রসূল। আবার আল্লাহ বলেন, তোমরা রসূলের আনুগত্য করলে নবীর সঙ্গী হবে (নেসা-৬৯)। এই আয়াতের উল্লেখিত রসূল নিশ্চয়ই নবী নহে, ভিন্ন ব্যক্তি। আবার সুরা হজ্বের ৫২ নং আয়াতে বলা হয়েছে অনেক রসূল আছে যারা নবী নহে। অতএব, নবী এবং রসূলের মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য আছে, আর সেই পার্থক্যটাই হচ্ছে প্রত্যেক নবীর উপরেই কিতাব বা ওহী নাযিল হয়েছে (ইমরান-৮১), (নেসা-১৬৩) এবং প্রত্যেক নবীকেই নবুয়ত দেওয়া হয়েছে। (ইমরান-৭৯)। প্রত্যেক নবীর উপর নবুয়ত, ওহী, কিতাব নাযিল হওয়ার পরে তাকে রেসালত দেওয়া হয়েছে। (জ্বীন-২৩) এজন্য প্রত্যেক নবীই রসূল। কিন্তু প্রত্যেক রসূলই নবী নহে। (হজ্ব-৫২)। নবী এক সময় শেষ হবে (আহযাব-৪০)। কিন্তু ইবলিশকে প্রতিহত করার জন্য রসূল (সূরা নাহল-৩৬) কাজেই ইবলিশ যত দিন জীবিত থাকবে ততোদিন রসূল থাকবে এটা নিশ্চিত। এইজন্য রসূল বিরতিহীন একের পর এক আসবে (মমিন-৪৪)। কাজেই সম্যক গুরুগণই রসূল। তারা কোন বিনিময় গ্রহণ করে না। এই মর্মে আল্লাহ বলেন, যারা কোন বিনিময় গ্রহণ করে না, এবং সঠিক পথে আছে, তুমি তাদের অনুসরণ কর (ইয়াসিন-২১)। বিধায় সম্যক গুরু তথা রসুলগণকেই অনুসরণ ও আনুগত্য করতে হবে। মনে রাখবেন এটাই হচ্ছে পবিত্র কোরআনের বুঝ। আল্লাহ বলেন কোরানের বুঝ যারা অপছন্দ করেন তাদের কর্মফল বিনষ্ট হবে (সূরা মোহাম্মদ-৯)।
আল্লাহ বলিলেন হে আদম তুমি ও তোমার স্ত্রী একই সাথে জান্নাতে বসবাস কর এবং যেথায় ইচ্ছা স্বচ্ছন্দে আহার করো। কিন্তু এই বৃক্ষের নিকটবর্তী হয়ো না। হলে তোমরা অন্যায়কারী হইবে (২ঃ৩৫) (৭ঃ১৯)। কিন্তু শয়তানের প্রবঞ্চ দ্বারা আদম ও তার স্ত্রী আক্রান্ত হইয়া তাহারা নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফলের আস্বাদ গ্রহণ করিল (৭ঃ২২) (২০ঃ১২১)। তখন তাদের লজ্জস্থান তাদের নিকট প্রকাশ পাইল (৭ঃ২২) (২০ঃ১২১)। তখন তারা বলল হে আমার প্রভু আমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করিয়াছি বা অন্যায় করিয়াছি (৭ঃ২৩)। তুমি যদি আমাদের ক্ষমা না করো বা দয়া না করো তাহলে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হইবো (৭ঃ২৩)। ইহার পর তাহার প্রভু তাকে মনোনিত করিলেন (২০ঃ১২২)। তাহার প্রভু তার তওবা কবুল করিলেন (২০ঃ১২২)। অতঃপর আদম তার প্রভুর নিকট থেকে কিছু বাণী প্রাপ্ত হইলেন (২ঃ৩৭)। অতঃপর তাহার প্রভু তাকে ক্ষমা করিলেন (২ঃ৩৭) ও তাকে পথ নির্দেশ দিলেন (২০ঃ১২২)। তোমরা সকলেই একইসঙ্গে নামিয়ে যাও (২ঃ৩৮) (২০:১২৩)। সকলেই বলতে আদম ও তার স্ত্রী এবং শয়তাকে বোঝানো হয়েছে। আল-কোরানুলকারীম ইসলামিক ফাউন্ডেশনের টীকা নং-৪৫১ ও ১০৬৩। এখানে উল্লেখ যে, যেহেতু আল্লাহ আদম ও তার স্ত্রীকে ক্ষমা করলেন, সেহেতু উহাদের উভয়ের ভিতরে শত্রুতা বা বিচ্ছেদ না রাখিয়া একইসাথে জান্নাত থেকে দুনিয়ায় পাঠিয়ে দিলেন। কিন্তু শয়তানকে তাহাদের শত্রু হিসেবে এই মর্মে আল্লাহ বলেন তোমরা উভয়ের জান্নাত থেকে নামিয়া যাও পরস্পরের শত্রু হিসেবে (২০ঃ১২৩)। (৭ঃ২৪) পরস্পর শত্রু হিসেবে বলতে আদম ও তার স্ত্রীর সাথে শয়তানকে শত্রু হিসেবে বোঝানো হয়েছে। কারণ ইবলিশকে ক্ষমা করা হয়নি। সে ছিল লা’নতপ্রান্ত (১৫ঃ৩৪) এবং ইবশিসতো ধিকৃত ও বিতাড়িত অবস্থায় জান্নাত থেকে নামিয়া গেল (৭ঃ১৮)। সে মুমিনদের অন্তর্ভুক্ত নহে। পক্ষান্তরে আদম ও তার স্ত্রীকে যেহেতু ক্ষমা করিল ও তাকে পুনরায় মনোনিত করিল (২০ঃ১২২)। সেহেতু মুমিন অবস্থায় আদম ও তার স্ত্রীকে জান্নাত থেকে নামাইয়া দেওয়া হয়েছে বিধায় পরস্পর শত্রু বলতে এখানে মুমিনদের ইবলিশের শত্রুতাকে বোঝানো হয়েছে বিধায় পরস্পর শত্রু বলতে আদম ও তার স্ত্রীর সাথে ইবলিশের শত্রুতাকে বোঝানো হয়েছে। আল্লাহ আরও বলিলেন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে পথ নির্দেশ আসিবে (২ঃ৩৮)। তখন যাহারা উহা অনুসরণ করিবে তাহাদের কোন ভয় নাই (২ঃ৩৮)। পৃথিবীতে তাদের জন্য বসবাস ও জীবিকার ব্যবস্থা থাকবে (৭ঃ২৪) এবং সেখানে মৃত্যুর ব্যবস্থাও থাকবে (৭ঃ২৫)। কিন্তু সেখানে শয়তান তাদের শত্রুতা পোষণ করিবে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করার জন্য। উপরোক্ত আয়াতগুলিতে প্রতীয়মাণ হয় যে, আদম (আ.) বেহেস্তে থাকা অবস্থায় তার ভুল বোঝতে পেরে প্রভুর কাছে ক্ষমা চাইলো এবং তওবা করিল। প্রভু তাদের তওবা কবুল করিল ও ক্ষমা করিল। অতঃপর পৃথিবীতে একইসাথে নামিয়ে দিলো। যেহেতু আদম ও তার স্ত্রীকে ক্ষমা করার পর একইসাথে নামিয়ে দিলো। তাতে প্রমাণ হয় যে, উহারা একইস্থানে পরস্পর স্বামী-স্ত্রী হিসাবে অবস্থান করেছিলো। সেক্ষেত্রে অনেকেই বলে তিনশ বছর পৃথিবীতে আদম ও হাওয়া কান্নার পরে তাদের ক্ষমা করেছে এ কথার কোন ভিত্তি নেই।
মিথ্যাকে বর্জন করাই সত্যকে ধারণ করা। অধর্ম যাহা তাহা ত্যাগ করাই ধর্ম। অন্যায়কে বর্জন করাই ন্যায়ের পথে থাকা। কাহারো প্রতিপক্ষকে সমর্থন না করাই তার পক্ষে থাকা বোঝায়। ঠিক তদরূপ নবী (সা.)-এর বিপরীত দল ইবলিশের দল আর ইবলিশের পক্ষে না থাকায় নবী (সা.)-এর পক্ষে থাকা। অর্থাৎ ইবলিসের অনুসরণ না করাই নবী (সা.)-এর অনুসরণ করা। নবী (সা.)-এর অনুসরণ করার ৩টি উপায় : (১) নবী (সা.) জীবিত থাকা অবস্থায় তাকে অনুসরণ করাটা সহজ ছিল। কিন্তু যখন তিনি উফাৎ হয়েছে তার পর থেকেই ঐ ভাবে নবী (সা.)কে অনুসরণ করাটা কঠিন হয়ে গেছে। (২) নবী করিম (সা.) কোরআন ব্যতিত অন্য কোনকিছু অনুসরণ করে নাই (৬:৫০)। অর্থাৎ তিনি একমাত্র কোরআনই অনুসরণ করেন। তাই কোরআন অনুসরণ করার মাধ্যমে নবী করিম (সা.)কে অনুসরণ করা যায়। কিন্তু একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্পূর্ণভাবে কোরআন জেনে তাহা অনুসরণ করাও কঠিন। (৩) ইবলিসের অনুসরণ না করার মাধ্যমে নবী (সা.)কে অনুসরণ করা এটা একটা সহজ উপায় কারণ নবী (সা.) উফাত হয়েছে বিধায় তাকে অনুসরণ করা কঠিন। কিন্তু ইবলিশ তো মরে নাই। ইবলিশ কিয়ামত দিবস পর্যন্ত জীবিত থাকবে (১৫:৩৮)। কাজেই একজন জীবিত ব্যক্তিকে অনুসরণ করা যেমন সহজ তেমনই তাকে দেখে তাকে অনুসরণ না করাটাও তেমনি সহজ। যেহেতু ইবলিশের অনুসরণ না করাই নবী (সা.)-এর অনুসরণ করা বোঝায়। আর নবী (সা.)-এর অনুসরণ করা আমাদের সকলের জন্য জরুরি। কারণ আল্লাহ বলেন তোমরা যেসমস্ত কর্মে লিপ্ত আছো আল্লাহর দয়া ও ক্ষমা ছাড়া মাহশাস্তি কেউ রেহাই পাবে না (২৪:১৪)। অনেকেই নেকির পাল্লা ভারি করার লক্ষ্যে নেকি সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কিন্তু নেকির পাল্লা কাহারো ভারি হবে না। পাপের পাল্লাই ভারি হবে। আর তাই আল্লাহ দয়া ও ক্ষমার প্রয়োজন হবে। নেকি সংগ্রহে ব্যস্ত না হয়ে আল্লাহর কাছে পাপ কিভাবে ক্ষমা পাওয়া যায় কিংবা কিভাবে দয়া ও ক্ষমা পাওয়া যায় সে চেষ্টা করাই প্রত্যেকের জন্য জরুরি কাজ। আর পাপ মুক্তি ও দয়া ক্ষমার বিষয়ে আল্লাহ বলেন যাহারা নবী (সা.)কে অনুসরণ করিবে তাদের পাপ আল্লাহ ক্ষমা করিবেন (৩:৩১)। উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেল নেকি ও পাপ ওজন করা হবে ঠিক। কিন্তু নেকির পাল্লা কাহারো ভারি হবে না। বরং পাপের পাল্লাই ভারি হবে। আর তাই পাপ মাফ হওয়া দরকার। আর পাপ ক্ষমা পেতে হলে নবী (সা.)-এর অনুসরণ করা দরকার। আর নবী (সা.)কে সহজে অনুসরণ করতে হলে ইবলিসের অনুসরণ করা থেকে বিরত থাকা দরকার। আর ইবলিসের অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে গিয়ে আরেকটি সমস্যা দেখা গেল। আর সেটা এমন যে, আপনি ইবলিসের অনুসরণ করছেন না ঠিক, কিন্তু ইবলিস আপনার অনুসারি হয়ে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে ইবলিসের যে দুর্গতি আপনারও সেই দুর্গতি। সেক্ষেত্রে আপনি ইবলিসের অনুসরণ থেকে বিরত থেকেও ইবলিসের দলভুক্তই থেকে যাচ্ছেন বিধায় আপনি নবী (সা.)-এর দলভুক্ত হতে পারলেন না বিধায় আপনি দয়া ও ক্ষমার আওতাভুক্ত হতে পারলেন না। তাই আপনাকে এমন একটাকিছু করতে হবে যাতে ইবলিস আপনার অনুসরণ করতে না পারে। সেক্ষেত্রে আপনি এমনটা মনে করতে পারেন যে, আপনি সালাত আদায় করেন ইবলিশ হয়তো সালাত আদায় করে না, কিন্তু না। দেখা যায় আপনি প্রচলিত পদ্ধতিতে লোক দেখানো সালাত আদায় করেন। ইবলিসও ঐ প্রক্রিয়ায় সালাত আদায় করে (সুরা মাউন আয়ত নং-৬)। আপনি প্রচলিত পদ্ধতিতে ইবাদত করেন যেমনটা ইবলিসও করেন। অর্থাৎ আপনি আল্লাহ বিশ্বাস করেন ও আখেরাতও বিশ্বাস করেন। ঠিক ইবলিসও আল্লাহ ও আখেরাত বিশ্বাস করে তারপরেও সে মুমিন নহে (২:৮)। আপনি আল্লাহ ও রসুল বিশ্বাস করেন ইবলিসও আল্লাহ ও রসুল বিশ্বাস করে (২৪:৪৭)। আপনি আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য স্বীকার করেন ইবলিসও আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য স্বীকার করে, তার পরেও সে মুমিন নহে (২৪:৪৭)। আপনি আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করেন। ইবলিসও আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা বর্ণনা করেন (৫৭:১)। আপনি জাহান্নাম ও জান্নাত বিশ্বাস করেন ইবলিশও জাহান্নাম ও জান্নাত বিশ্বাস করেন। কারণ সে তো জান্নাত থেকেই বহিস্কৃত (১৫:৩৪)। আপনি কিয়ামত দিবস বিশ্বাস করেন। ইবলিশও কিয়ামত দিবস বিশ্বাস করেন (১৫:৩৬) (৩৮:৭৯)। আপনি আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পন করেন। ইবলিসও আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণকারী (৩:৮৩)। আপনি আল্লাহকে সেজদা করেন, ইবলিসও আল্লাহকেই সেজদা করেন (১৩:১৫)। আপনি আল্লাহকে প্রভু বলে স্বীকার করেন, ইবলিসও লা’নত ঘোষণা করার পরও আল্লাহকে প্রভু বলেই স্বীকার করে (১৫:৩৬)। তাহলে দেখা গেল, আপনি হয়তো ইবলিসের অনুসরণ করা থেকে বিরত আছেন। কিন্তু ইবলিসও উপরোক্ত কাজগুলি করে আপনার অনুসারী হয়ে গেছে। ইবলিস যেন আপনার অনুসারি হতে না পারে সেক্ষেত্রে আপনার করণীয় কি? এজন্য আপনাকে এমন কিছু করতে হবে যেন ইবলিস আপনাকে অনুসরণ করতে না পারে। এই জন্য আপনাকে আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা দিতে হবে। আর আপনি যখন আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা দিবেন তখন ইবলিস আপনাকে অনুসরণ করতে পারবে না। কারণ ইবলিস কখনো আদম সেজদায় সামিল হবে না (১৫:৩৩)। কারণ ইবলিস তো আদম সেজদা না দিয়েই কাফের (২:৩৪)। তাহলে দেখা গেল জান্নাতে যেতে হলে আমলনামা ডান হাতে দরকার। আমলনামা ডান হাতে পেতে হলে নেকির পাল্লা ভারি হওয়া দরকার। আর নেকির পাল্লা ভারি হতে হলে পাপ ক্ষমা হওয়া দরকার (২৪:১৪)। আর পাপ ক্ষমা পেতে হলে নবী (সা.)-এর অনুসারি হওয়া দরকার (৩:৩১)। আর নবীর অনুসরণ করার সহজ উপায় হচ্ছে ইবলিসকে অনুসরণ না করা দরকার। আর ইবলিসের অনুসরণ থেকে বিরত থাকতে হলে আদমকাবায় সেজদা করা দরকার। আর আদমকাবায় সেজদা করতে হলে একজন সম্যক গুরু তথা রসুলের কাছে বায়াত হওয়া দরকার। কাজেই নবী (সা.)-এর অনুসারি হওয়ার সহজ উপায় হচ্ছে সম্যক গুরুর কাছে বায়াত হয়ে আদমকাবায় সেজদা দিয়ে ইবলিস মুক্তি হওয়া। কারণ দল মূলত দু’টি। একটি নবী (সা.) এর দল অপরটি ইবলিসের দল। আর আপনি যখন আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদায় সামিল হচ্ছেন তাতে প্রমাণিত হয় যে, আপনি আপনি ইবলিসের দলভুক্ত নহে। কিংবা ইবলিসের অনুসারি নহে এটা নিশ্চিত। আর আপনি যখন ইবলিসের অনুসারি নহে তাহলেই আপনি নবী (সা.)এর অনুসারি এটাও নিশ্চিত। আর তখন আপনার পাপ ক্ষমা হয়েছে এটাও নিশ্চিত (৩:৩১)। আর তখনই আপনি মহাশাস্তি থেকে রেহাই পাবেন এটাও নিশ্চিত (২৪:১৪)।
ন্যয় ও সত্যের দিক থেকে আল্লাহর কথাই পরিপূর্ণ (৬:১১৫)। নিশ্চয়ই এই কোরআনই ফুরকান (২:১৮৫)। এই আয়াতে ফুরকান শব্দ এসেছে যার অর্থ হচ্ছে সত্যকে অসত্য হইতে পৃথক করে দেওয়া (আল কুরআনুল কারী ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ টিকা নং-৩৭)। তাই প্রচলিত দ্বীনের মধ্যে যে সমস্ত মিথ্যা প্রবেশ করে দ্বীন হিসাবে প্রচলিত হয়ে গেছে এই কোরআন দিয়ে সেইগুলিকে পৃথক করে ফেলা দরকার। আল্লাহ বলে তোমরা সত্যের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করিও না ও সত্য গোপন করিও না (৩:৭১)। আর যে কোরআনের আয়াত গোপন করে আল্লাহ তাকে লানত দেয় (২:১৫৯)। প্রচলিত দ্বীনের যে কথাটি কোরআনে নেই সেটা বর্জন করা। কারণ এই কুরআনে যাহা নেই দ্বীনের ক্ষেত্রে তাহা প্রযোজ্য নহে। কারণ দ্বীনের ক্ষেত্রে এই কুরআনই পরিপূর্ণ (৫:৩)। আই তাই নবী (সা.)কে বিধান স্বরূপ এই কুরআনকেই দেয়া হয়েছে (২৮:৮৫)। আর এই কুরআন মোতাবেক দ্বীনের ক্ষেত্রে যারা বিধান দেয়না উহারাই জালিম, ফাসিক, কাফের (৫:৪৪), (৫:৪৫), (৫:৪৭)। তাই নবী (সা.) কুরআন বাদে দ্বীনের ক্ষেত্রে কোনকিছু অনুসরণ করে নাই (৬:৫০) এবং তিনি কুরআন বাদে কাউকে দ্বীনের বিষয়ে সতর্ক করে নাই (২১:৪৫)। আল্লাহ কিতাবিদেরকে সতর্ক করে বলেন, হে কিতাবিগণ সত্যের বিপরীতে দ্বীনের ভিতরে কোনকিছু প্রবেশ করাও না (৫:৭৭)। এই আয়াতে তাগলু শব্দ এসেছে যার অর্থ প্রবেশ করানো (আরবী অভিধান পৃষ্ঠা নং-৮৬৮)। অথচ কিতাবিরা আল্লাহর নিষেধ অমান্য করে কুরআনে যাহা নেই তা নিজ হাতে রচনা করে দ্বীনের ভিতরে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিয়েছে। তাদের জন্য আল্লাহ বলেন, দুর্ভোগ তাদের জন্য তারা নিজ হাতে কিতাব রচনা করে আল্লাহর নামে চালিয়ে দেয় এবং স্বল্পমূল্যে বাজারে বিক্রয় করে (২:৭৯)। তাহলে দেখা গেলো প্রচলিত দ্বীনের মধ্যে যে কথাটি কোরআনে নেই তাহা বর্জনীয়। কারণ প্রচলিত দ্বীনের যে বিষয়টি কুরআনে আছে অথচ কুরআনের বর্ণনার সাথে অবিকল মিল নেই। অর্থাৎ কুরআনে যেভাবে বলা হয়েছে সেভাবে না বলে অতিরিক্তভাবে বা অন্যভাবে বলা হয়েছে। যতটুকু কুরআনে সাথে গড়মিল ততোটুকু বর্জন করে কুরআনে যেভাবে বলা হয়েছে সেইভাবে পালন করা। আবার প্রচলিত দ্বীনের যে কথাটি কুরআনের কোনো আয়াতের পরিপন্থী সেইগুলিও বর্জন করা। কুরআনের বাইরে প্রচলিত দ্বীনের ভিতরে যে বিষয়গুলি অনুপ্রবেশ ঘটেছে সেইগুলি নিম্নে বিস্তারিত আলোচিত হলো :
(১) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে চুল ও গোফ রাখা হারাম কিন্তু চুল ও গোফ রাখা হারাম এমন আয়াত কোরআনে নেই। সুরা ইমরানের ৯৩নং আয়াতে বলা হয়েছে যাহা হারাম করা হয়েছে তাহা ব্যতিত সকল কিছু হালাল। তাহলে প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে যারা চুল ও গোফ রাখা হারাম বলে তারা সীমা লংঘনকারী (৫:৮৭)। এই আয়াতে বলা হয়েছে তোমরা কোন হালাল বস্তুকে হারাম বলিও না। অর্থাৎ চুল ও গোফ রাখা হারাম নহে। পক্ষান্তরে আল্লাহ বলেন, যতক্ষন পর্যন্ত তোমরা হজ্বের উদ্দেশ্যে কাবাঘরে না পৌছাবে ততক্ষণ পর্যন্ত চুল কর্তন করিও না বা মাথা ম-ন করিও না (২:১৯৬)। এই আয়াতে লা-তাহ্লিক শব্দও এসেছে। লা অর্থ নাবোধক। আর হালিক শব্দের অর্থ চুল কাটা বা মাথা মু-ন করা (আরবি অভিধান পৃষ্ঠা নং ১২০৮)। এই আয়াতে কিন্তু দাড়ি ও গোফ কর্তনের কথা বলা হয় নাই। অতএব যারা দ্বীনের স্বার্থে হজ্বের উদ্দেশ্যে ক্বাবা ঘরে না পৌছে অহেতুক চুল ও গোফ কর্তন করেন তারা (২:১৯৬) আয়াতের পরিপন্থী। তারা চুল ও গোফ অহেতুক কর্তন করে, তাহারা ঐগুলি সৃষ্টির যে উদ্দেশ্য ছিল তাহা ব্যর্থ করেন। কারণ আল্লাহ অহেতুক কোনোকিছু সৃষ্টি করে নাই (৩৮:২৭) (২১:১৬)। অহেতুক ঐগুলি কর্তন করিলে আল্লাহর আয়াতের উদ্দেশ্য ব্যর্থ করা সামিল হবে। আর যারা আল্লাহপাকের আয়াতের উদ্দেশেকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করে তাদের জন্য কঠিন শাস্তি জাহান্নাম (২২:৫১)। অতএব অহেতুক চুল দাড়ি গোফ কর্তন করাটা আল্লাহ-পাকের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার সামিল বলে গণ্য হয় বিধায় অহেতুক চুল-দাড়ি-গোফ কর্তন করা থেকে বিরত থাকা দ্বীনের ক্ষেত্রে উত্তম। বর্তমানে যারা অহেতুক চুল-দাড়ি-গোফ কর্তন করে তাদের বৈশিষ্ট্য থেকেই আমরা তাদের অতীত পরিচয় জেনে নিতে পারি। সেক্ষেত্রে দেখা যায় বর্তমানে যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে অহেতুক চুল ও গোফ কর্তন করে তারা আদম কাবায় আল্লাহকে সিজদাকারী নহে। আর যারা আদমকাবায় আল্লাহকে সিজদা করে না উহারই ইবলিসের অনুসারী। কারণ ইবলিশ তো আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫:৩৬)। অথচ আদমকে সিজদা না দিয়েই ইবলিশ কাফের (২:৩৪)। আর ইবলিশ তো আদম সেজদায় সামিল হবে না (১৫:৩৩)। অতএব বর্তমানে যারা দ্বীনের ক্ষেত্রে অহেতুক চুল ও গোফ কর্তন করে তাদের পূর্বপুরুষগণ চুল ও গোফ কর্তন করতো। আর চুল ও গোফ কর্তনকারী লোকেরাই তখনও আদামকাবায় সেজদার বিরোধীতা করতো, এরাই হচ্ছে এজিদের দলভুক্ত। এরাই হযরত আলীকে কতল করেছিল এবং এরাই কারবালা প্রান্তরে নবী (সা.)-এর অনুসারীদেরসহ ইমাম হোসাইনকেও কতল করেছিলো। এবং ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যু ঘটাইয়েছিল। এদের থেকে নবী (সা.)-এর সত্য দ্বীনকে উদ্ধার করতে হলে কুরআনের বিপরীতে তথা সত্যের বিপরীতে দ্বীনের ভিতরে যাহা প্রবেশ করেছে তা বর্জন করতে হবে। অর্থাৎ অহেতুক চুল-দাড়ি-গোফ কর্তন করা থেকে বিরত থেকে নবী (সা.)-এর দ্বীনকে কায়েম করতে হবে। আর এটাই হচ্ছে রিসালাতের কাজ। রিসালাতের কাজটি যে না করলো তার যেন কিছুই করা হলো না (৫:৬৭)।
(২) যেহেতু টুপি পাগড়ী ও লম্বা লেবাস দ্বীনের ক্ষেত্রেও উত্তম পোশাক এমন আয়াত কুরআনে নেই। পক্ষান্তরে কুরআনে এসেছে যে পোশাকটি লজ্জাস্থান ঢাকার জন্য নির্ভরশীল তাহাই উত্তম পোশাক (৭:২৬)। সেক্ষেত্রে দেখা যায় টুপি পাগড়ী ও লম্বা লেবাস লজ্জাস্থান ঢাকিবার জন্য নির্ভরশীল নয় বরং যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুদের আক্রমণ থেকে নিজের লজ্জাস্থান নিরাপদ রাখার জন্য প্যান্ট-শার্ট-ই উত্তম পোশাক। তাহলে দেখা যায়, কুরআন মোতাবেক উত্তম পোশাক বলতে প্যান্ট-শার্টকেই বোঝায়। সেক্ষেত্রে টুপি পাগড়ি ও লম্বা লেবাস দ্বীনের ক্ষেত্রে উত্তম পোশাক হিসেবে ব্যবহার করা সুরা আরাফের ২৬ নং আয়াতের পরিপন্থী। অতএব যারা বর্তমানে টুপি পাগড়ী ও লম্বা লেবাসকে দ্বীনের উত্তম পোশাক হিসেবে ব্যবহার করে তাদের বর্তমান পরিচয় থেকে অতীত পরিচয় জেনে নেওয়া দরকার। বর্তমানে যারা ঐগুলি ব্যবহার করে তারা মূলত কেহই আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী নয়। আর যারা আদমকাবায় আল্লাহকে সিজদা করে না উহারই ইবলিসের অনুসারী। কারণ ইবলিশ তো আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫:৩৬)। অথচ আদমকে সিজদা না দিয়েই ইবলিশ কাফের (২:৩৪)। আর ইবলিশ তো আদম সেজদায় সামিল হবে না (১৫:৩৩)। অতীতেও যারা টুপি পাগড়ি লম্বা লেবাস পরিধান করিত দ্বীনের ক্ষেত্রে তখনও তারা আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী ছিলেন না। এরাই হযরত আলীকে কতল করেছিল এবং এরাই কারবালা প্রান্তরে নবী (সা.)-এর অনুসারীদেরসহ ইমাম হোসাইনকেও কতল করেছিলো। এবং ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যু ঘটাইয়েছিল। আসলে এই টুপি পাগড়ি ও লম্বা লেবাস মূলত এজিদী দলের পোশাক। যাহা সত্যের বিপরীতে দ্বীনের ভিতরে কিতাবীরা প্রবেশ করিয়েছে। এগুলি বর্জন করে নবী (সা.)-এর অনুসারীদের তরীকাপন্থি যারা আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী তাদের বেশ ধারণ করার অর্থাৎ চুল-দাড়ি-গোফ কর্তন না করার মাধ্যমে নবী (সা.)-এর দ্বীন কায়েম করা ও দ্বীন প্রচার করা। কারণ নবী (সা.) স্বরূপে সেজদাকারী ছিলেন (৭:২৯)।
(৩) যেহেতু পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করার কথা কুরআনে নাই। তবে সালাতের বিষয়ে সুরা বনি ইসরাইলের ৭৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে সূর্য পশ্চিমদিকে হেলে পড়ার পর হতে রাতের ঘন অন্ধকার পর্যন্ত সালাত কায়েম করো। আবার সুরা হুদের ১১৪ নং আয়াতে সালাতের বিষয়ে বলা হয়েছে দিনের শেষ ভাগে এবং রাতের প্রথম ভাগে সালাত কায়েম করো। আল্লাহ বলেন এই সময়সীমার মধ্যবর্তী সময়ে সালাত হেফাজত কর (২:২৩৮)। উপরোক্ত তিন আয়াতে দেখা যায় সালাতের বর্ণনা এসেছে অথচ সেখানে পাঁচ ওয়াক্ত কথাটা আসেনি। অথচ প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করা ফরজ করা হয়েছে। অতএব প্রচলিত দ্বীনের এই পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কথাটি সুরা বণি ইসরাইলের ৭৮ নং আয়াত এবং সুরা হুদের ১১৪ নং আয়াতের এবং (২:২৩৮) আয়াতে উল্লেখ নেই বিধায় দ্বীনের ক্ষেত্রে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম করাটা কিতাবীরা কুরআনের বিপরীতে দ্বীনের মধ্যে নিজহাতে কিতাব লিখে আল্লাহর নামে চালিয়ে দিয়েছে বিধায় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েম কথাটা কুরআন ভিত্তিক নহে বিধায় উহা ফরজ নহে। তারপরও বর্তমান থেকে অতীতে গেলে দেখা যায় যারা বর্তমানে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের সাথে সম্পৃক্ত তারা কেউ আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদাকারী নহে। এরা ধারণা কল্পনা বা অনুমানে আল্লাহকে সেজদা করে। যেভাবে সেজদা ইবলিশও আল্লাহকে করে (১৩:১৫)। ইবলিশও আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫:৩৬) অথচ ইবলিশও আদমকে সেজদা না দিয়েই কাফের (২:৩৪)। আর ইবলিশ তো আদম সেজদার সামিল হবে না (১৫:৩৩)। আবার ইবলিশও সালাত আদায় করে (১০৭নং সুরা মাউন আয়াত নং-৬)। অতএব বর্তমানে যারা পাঁচ ওয়াক্ত সালাত কায়েমকে ফরজ গণ্য করে অথচ আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা করে না তারাই মূলত ইবলিশের অনুসারী আর আল্লাহ বলেন তোমরা ইবলিশের অনুসরণ করিও না। সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু (২:১৬৮)। আল্লাহ আরো বলেন তুমি ইবলিশের অনুসরণ করিও না এবং সেজদা কর ও আমার নিকটবর্তী হয়ে যাও (৯৬:১৯)। এরাই হচ্ছে এজিদের দলভুক্ত। এরাই হযরত আলীকে কতল করেছিল এবং এরাই কারবালা প্রান্তরে নবী (সা.)-এর অনুসারীদেরসহ ইমাম হোসাইনকেও কতল করেছিলো। এবং ইমাম হাসানকে বিষ প্রয়োগে মৃত্যু ঘটাইয়েছিল। এদেরকে বর্জন করে আদমকাবায় সেজদাকারীদের দলভুক্ত হয়ে নবী অনুসারী হওয়া প্রত্যেকের উচিত। কারণ নবী (সা.) ইবলিশের অনুসারী ছিলেন না কারণ তিনি নিজেও স্বরূপে সেজদাকারী ছিলেন (৭:২৯)।
(৪) যেহেতু আযান শুনে তাড়াতাড়ি মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করার কথাটা কুরআনে উল্লেখ নেই। সেহেতু সেটা ফরজ নহে। তারপরও জামাতের সাথে সালাত আদায় করাটাকে অধিক গুরুত্ব দেওয়াটা সুরা ইউনুসের ৮৭ নং আয়াতের পরিপন্থি। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে প্রয়োজনে তোমরা তোমাদের বাসগৃহেই সালাত আদায় করো।
(৫) যেহেতু শুক্রবারে আযান শুনে সালাতের জন্য দূরদুরান্ত থেকে মসজিদে যাওয়াটা সকল নারী-পুরুষের জন্য জুলুমে গণ্য হয় বিধায় আল্লাহ বলেন, মক্কা ও মক্কার চারপাশের আখিরাতে বিশ্বাসী মোমিন লোকদেরকে বল তারা যেন সালাত হেফাযত করে (৬:৯২)। অর্থাৎ শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে সালাত আদায় করার বিষয়টা মক্কা ও তার চারপাশের মোমিনদের ব্যতিত অন্য দেশের মোমিনদের জন্য প্রযোজ্য নহে। মক্কা থেকে দূরবর্তী এলাকা কিংবা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মানুষদের জন্য জুমার দিনে মক্কায় গিয়ে মসজিদে সালাত আদায় করা জুলুমে গণ্য হয় বিধায় ৬২নং সুরা জুমআর ৯নং আয়াতে জুমআর দিনে মসজিদে যাওযার কথা উল্লেখ করে নাই। শুক্রবারে মসজিদে গিয়ে জামাতের সাথে সালাত আদায় করাটা সুরা আনামের ৯২নং আয়াত এবং সুরা বাকারার ২৫৬নং আয়াত এবং সুরা কাহফের ৪৯নং আয়াত পরিপন্থি। এই আয়াতে বলা হয়েছে দ্বীনের ক্ষেত্রে আল্লাহ কাহারো উপরে জুলুম করে না।
(৬) যেহেতু হজ্বের বিষয়টা ক্বাবাঘর কেন্দ্রিক (৩:৯৭)। সেক্ষেত্রে ক্বাবাঘরের বাইরে হজ্বের কোন বিধান নেই। আর সকল মোমিন ব্যক্তিই হজ্বের জন্য যোগ্য (৩:৯৭)। কারণ মুশরিকদের জন্য কাবাঘরে হজ্বে যাওয়া নিষেধ (৯:৩) (৯:২৮) গরীব মোমিনদের জন্য হজ্ব নিষেধ এমন আয়াত আসে নাই পক্ষান্তরে গরীবদের হজ্বে গিয়ে কুরবাণী না দিতে পারলে ১০ দিন সিয়াম পালনের বিধান রেখে দেওয়া হয়েছে (২:১৯৬)। তাতে প্রমাণ হয় গরীব মোমিনরাও হজ্বের জন্য যোগ্য। কাজেই শুধুমাত্র মোমিন ব্যক্তিরাই হজ্বের জন্য যোগ্য। আর ধনী-গরিব সকল মোমিনদের জন্য হজ্ব ফরজ। আর সেক্ষেত্রে মক্কা তথা বর্তমান সৌদি আরব দেশের বাইরে দেশ থেকে হজ্বের উদ্দেশে ক্বাবাঘরে আসা একজন গরীব মানুষের জন্য জুলূমে গণ্য হয় বিধায় আল্লাহ হজ্বের জন্য সীমানা নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন (২২:২৭)। এই আয়াতে বলা হয়েছে যতদূর থেকে মানুষ পায়ে হেটে ক্বাবাঘরে আসা সম্ভব শুধু ততদূর পর্যন্ত এলাকা থেকে ধনী-গরিব সকাল মোমিন ব্যক্তিগণ হজ্বের জন্য ক্বাবাঘরে আসিবে। সেক্ষেত্রে মক্কা তথা বর্তমান সৌদি আরব দেশের বাইরের অন্যান্য দেশ থেকে হজ্ব করতে যাওয়ার বিষয়টা জুলুমে গণ্য হয় বিধায় সুরা বাকারার ২৫৬নং আয়াত এবং সুরা কাহফের ৪৯নং আয়াত এবং সুরা হজ্বের ২৭ নং আয়াতের পরিপন্থি।
(৭) যেহেতু পশু কোরবানির বিষয়টা হজ্বের সাথে সম্পর্কিত (২:১৯৬) আর পশু কোরবানির স্থানটিও প্রাচীন গৃহের সীমানার ভিতরে (২২:৩৩)। সেহেতু প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে হজ্বের সাথে সম্পৃক্ত নয় এমন ব্যক্তিগণ শত্রুদের দ্বারা বাধাগ্রস্থ না হয়ে ক্বাবাঘরের সীমানার বাইরে তথা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পশু কোরবানি দেওয়াটা সুরা হজ্বের ৩৩নং আয়াত ও বাকারায় ১৯৬নং আয়াতের পরিপন্থী বলে গণ্য হয়।
(৮) দিনে রাতে ২৪ ঘণ্টায় সালাত কায়েম করার জন্য সময়। অর্থাৎ সালাতের বিষয়টা সার্বক্ষণিক। ৭০নং সুরা মা-আরিজ ২৩নং আয়াত। তবে ২৪ ঘণ্টাকে দুই ভাগে ভাগ করে ১২ ঘণ্টা ফরজ ও ১২ ঘণ্টা তাহাজ্জুত করা হয়েছে। তবে ফরজ ১২ ঘণ্টার শুরুটা হচ্ছে সূর্য পশ্চিম দিকে হেলে পরার পর হইতে রাত গভীর অন্ধকার পর্যন্ত। সেক্ষেত্রে দিনের দুপুর ১২টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত (১৭:৭৮)। আর বাকি ১২ ঘণ্টা তাহাজ্জুত (১৭:৭৮)। যেহেতু সালাতটা সার্বক্ষণিক আর সেক্ষেত্রে যদি নির্দিষ্ট একটি সময়ে আযান দেওয়া হয় তাহলে আযানের পর সময়টি সালাতের জন্য উপযোগী ছিল না বা সালাতের জন্য প্রযোজ্য নহে বলে গণ্য হয়। এই জন্য সালাতের সময় আযান দেওয়ার কথাটা কোরআনে আল্লাহ বলেন নাই। সেক্ষেত্রে সালাতের সময়ে আযান দেওয়া প্রচলিত দ্বীনের এই বিষয়টি সুরা মা-আরিজের ২৩নং আয়াতের পরিপন্থী বলে গণ্য হয়।
(৯) যেহেতু রোজা একটি কঠিন আমল (২:১৮৭)। তার পরও রোজার শেষে রাতে তারাবীর সালাত আদায় করাটা রোজাদারদের জন্য জুলুমে গণ্য হয়। তাছাড়া তারাবিহটা রোজার অংশ নহে কিংবা কুরআনে তারাবীহ সালাত আদায় করার কথা বলা হয় নাই। তারপরেও প্রচলিত দ্বীনের বিধান অনুসারে তারাবীহ সালাত আদায় করাটা রোজা দারদের জন্য জুলুমে গণ্য হয়। সেক্ষেত্রে তারাবীহ সালাত আদায় করার বিষয়টা বাধ্যতামূলক হলে সুরা বাকারার ২৫৬নং আয়াত এবং সুরা কাহফের ৪৯নং আয়াতের পরিপন্থি বলে গণ্য হয়।
(১০) যেহেতু সবে বরাতের সালাত আদায় করা ও ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সালাত আদায় করার কথা কুরআনে উল্লেখ নেই। তার পরও যদি এটা সর্বসাধারণের জন্য প্রথা হিসেবে চালু করা হয় তাহলে সেটা সকল মানুষের জন্য একই সময়ে পালন করা জুলুমে গণ্য হয়। প্রচলিত দ্বীনের এই বিষয়টি সুরা বাকারার ২৫৬নং আয়াত এবং সুরা কাহফের ৪৯নং আয়াতের পরিপন্থি বলে গণ্য হয়।
(১১) যেহেতু আল্লাহর কোন আকৃতি নেই কথাটি কুরআনে উল্লেখ নেই, অতএব আল্লাহর কোন আকৃতি নেই কথাটা কুরআন ভিত্তিক নহে। আল্লাহর কোন আকৃতি নেই প্রচলিত দ্বীনের বিষয়টি সুরা সাদের ৭৫নং আয়াত এবং সুরা সেজদার ৪ নং আয়াত এবং সুরা কালামের ৪২ নং আয়াত এবং সুরা কাসাসের ৮৮ নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ উক্ত আয়াতগুলিতে আল্লাহর আকৃতির বিষয়ে বর্ণনা এসেছে।
(১২) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে ইজমা, কিয়াস, মানবরচিত দ্বীনের বিধান ও হাদিস দ্বীনের ক্ষেত্রে মিামংসার দলিল। এই দলিল দিয়ে দ্বীনের বিষয়গুলি পূর্ণ হয়। প্রচলিত দ্বীনের এহেন বিষয়টি সুরা মায়েদার ৪৪, ৪৫ ও ৪৭ নং আয়াত এবং ৩নং আয়াতের পরিপন্থী।
(১৩) প্রচলিত দ্বীনের ভাষ্যমতে নবী (সা.) বিদায় হজ্বের ভাষণে হাদীসকে দ্বীনের দলিল হিসাবে রেখে গেছেন প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি সুরা মায়েদার ৪৮ নং আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে ২টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। যে দুটির মধ্যে নবীর হাদিস কথাটা সংশ্লিষ্ট নহে। আর নবী (সা.) নিজেও নিজের কোন বিষয়কে দ্বীনের দলিল হিসাবে বলেন নাই। তিনি বিদায় হজ্বের ভাষণে আল্লাহর দেওয়া সুরা মায়েদার ৪৮ নং আয়াতের ঐ দুইটি বিষয় রেখে গেছেন। কারণ যদি তিনি নিজের কোন বিষয়কে দ্বীনের ক্ষেত্রে যুক্ত করতেন তাহলে তিনটি বিষয় রেখে যাওয়ার কথা উল্লেখ করতেন। কারণ আল্লাহর দেওয়া দুইটি এবং নবীর দেওয়া একটি। যেহেতু তিনি দুইটি বিষয় রেখে গেলাম বলেছেন তাহলে আল্লাহর দেওয়া ঐ দুইটিকেই তিনি রেখে গেছেন। কারণ তিনি তো আল্লাহর দেওয়া একটি বিষয় বাদ দিয়ে নিজের হাদিসটি দ্বীনের ভিতরে ঢুকিয়ে দিয়ে দুইটি বিষয় বলেন নাই। তিনি এমনটি করবেন না। কারণ তিনি ওহী ব্যতিত কাউকে দ্বীনের বিষযে সতর্ক করেন নাই (২১:৪৫)। এখন যদি কেউ হাদিসকে বিদায় হজ্বের ভাষণের দেওয়া বিষয় প্রমাণ করে। তাহলে সেই বুঝটা ২১নং সুরা আম্বিয়ার ৪৫নং এবং (৫:৪৮) নং আয়াতের পরিপন্থি।
(১৪) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাৎ সম্ভব নহে। হে মানুষ তোমরা কঠোর সাধনা কর অবশ্যই আল্লাহর সাক্ষাত ঘটবে (৮৪নং সুরা ইনশিকাক-৬)। সেক্ষেত্রে যদি সেই সাক্ষাৎটা মৃত্যুর পরে হবে বুঝায় সেক্ষেত্রে মৃত্যুর পরে তো কাফির রাও প্রভুর দর্শন লাভ করবে (১৯:৩৮)। তাহলে কঠোর সাধনার মাধ্যমে প্রভুর সাক্ষাতের বিষয়টা নিরর্থক বলে গণ্য হয়। সেক্ষেত্রে সুরা ইনশিকাকের আয়াত ব্যর্থ হয়। যেহেতু আল্লাহর কোন আয়াত ব্যর্থ হবে না (১১:২০)। তাহলে কঠোর সাধানার মাধ্যমে যে সাক্ষাত ঘটবে সেটা অবশ্য ইহকালেই। কাজেই ইহকালে আল্লাহর সাক্ষাত অসম্ভব, প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি ৪২নং সুরা শুরার ৫১ নং আয়াতে পরিপন্থী হয়। কারণ আল্লাহ ইহকালে তিন পদ্ধতিতে মানুষের সাথে কথা বলেন। (ক) ওহীর মাধ্যমে (খ) হিজাব বা ছদ্ব্যবেশ ধারণ করে (গ) বিশেষ দূত পাঠিয়ে। মুসা (আ.) নিজ রূপের ছদ্মবেশ বা হিসাব ধারণ করে আল্লাহ মুসার সাথে সাক্ষাত বা দর্শন দিয়ে বলেছিলেন হে মুসা তুমি জুতা খুলে আসো আমি পাহাড়ে অবস্থান করছি (২০:১২)। এই জন্য আল্লাহ বলেন আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছি। অতএব তোমরা মুসার সাথে আমার সাক্ষাতের বিষয়ে সন্দেহ করিও না (৩২:২৩)। আবার নবী (সা.)-এর নিজ আকৃতির ছদ্মবেশ ধারণ করে নবী (সা.)-এর সাক্ষাতে আল্লাহ স্থির হয়েছিল (৫৩:৬)। তাহলে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি অর্থাৎ ইহকালের আল্লাহ সাক্ষাত সম্ভব নয় কথাটি উক্ত আয়াত গুলির পরিপন্থী হয় (বিস্তারিত মুসার আল্লাহর দর্শন অধ্যায় দেখুন)।
(১৫) রাকাত গুণে ভাগে ভাগে কুরআনের আয়াত আবৃতি করার মাধ্যমে সালাত বা নামাজ পড়ার বিষয়টা সুরা আনকাবুতের ৪৫নং আয়াতের পরিপন্থী হয়। কারণ যদি কুরআনের অংশবিশেষ আবৃত্তির মাধ্যমে সালাত বা নামাজ পড়ার বিষয়টা হইত তাহলে এই আয়াতে বলা হইত কুরআন আবৃত্তির মাধ্যমে সালাত কায়েম কর। কিন্তু আয়াতে বলেছে কুরআন আবৃত্তি কর এবং সালাত কায়েম কর। তাহলে কুরআন আবৃত্তি সালাতের অংশ নহে। মুলত সেজদায় সালাত (৪:১০২)। তাছাড়া রাকাত গুণে ভাগে ভাগে সালাত বা নামাজ পড়ার কথা কুরআনে উল্লেখ নেই বরং উহা সুরা নেছার ১০২ নং আয়াত এবং সুরা আনকাবুতের ৪৫নং আয়াতের পরিপন্থী। অর্থাৎ সালাত পড়ার বিষয় নহে এটা কায়েম করা বিষয়।
(১৬) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে সালাত আদায়ের মাধ্যমে তোমরা ইহকাল ও পরকালের কল্যাণ কামনা কর। এইভাবে ইহকালের কল্যাণ কামনা করা সুরা বাকারার ২০০নং আয়াত এবং সুরা হুদের ১৫নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে ইহকালের কল্যাণ কামনা করে পরকালের শাস্তি।
(১৭) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে মানুষের বাম স্তনের দুই আঙুলের নীচে মানুষের কাল্ব। সেক্ষেত্রে আল্লাহ বলেন মানুষ এবং তার অন্তর এর কাছাকাছি আল্লাহ অবস্থান করে (৮:২৪)। আল্লাহর নিজের অবস্থান মানব শরীরের নির্দিষ্ট করে বলেন যে, তোমার গর্দানের শাহরগ অপেক্ষাও আমি অধিক নিকটে (৫০:১৬)। সেক্ষেত্রে দেখা যায় মানুষের পরিচয় তার চেহারার মধ্যে আল্লাহর অবস্থান যদি মানুষের অন্তরের বা কাল্বের কাছাকাছি হয়। আর আল্লাহর যদি মানুষের গর্দানের শাহরগ থেকে নিকটে অর্থাৎ মস্তিকের মধ্যে থাকে তাহলে কাল্বের অবস্থান নিশ্চিত মস্তিকে। বাম স্তনের দুই আঙুল নীচে নহে। অতএব প্রচলিত দ্বীনের বাম স্তনের নিচে কাল্বের অবস্থান এই কথাটি (৮:২৪) (৫০:১৬) আয়াতের পরিপন্থী (বিস্তারিত কাল্বের অবস্থান অধ্যায় দেখুন)।
(১৮) অনেকেই রসুল ব্যতিত দ্বীনের ক্ষেত্রে ৩য় ব্যক্তির আনুগত্য করে তাদের এই কথাটি সুরা নেছার ১৭১নং আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ বিশ্বাস করো, রসুল বিশ্বাস করো তিন বলিও না। কাজেই দ্বীনের ক্ষেত্রে রসুলের আনুগত্য এবং দুনিয়াবী ক্ষেত্রে উলিল আমরের আনুগত্য (৪:৫৯)। যদি কেহ দ্বীনের ক্ষেত্রে উলিল আমরের আনুগত্য করে রসুলের বিকল্প হিসাবে তাহলে (৪:৫৯)টি ব্যর্থ হবে। কারণ আয়াতে বলা রসুলের আনুগত্য কর এবং উলিল আমরের আনুগত্য কর। এখানে কিন্তু অথবা শব্দ আসে নাই। তাহলে দুইটি ফরজ। সেক্ষেত্রে রসুল হচ্ছে দ্বীনের ক্ষেত্রে আর উলিল আমর হচ্ছে দুনিয়াবি ক্ষেত্রে। যেমন রাজা বাদশা প্রধান মন্ত্রী ইত্যাদি। অতএব দ্বীনের ক্ষেত্রে রসুল ব্যতীত ৩য় কোন ব্যক্তির আনুগত্য করা শেরেক বলে গণ্য হবে বা (৪:১৭১) নং আয়াতের পরিপন্থি।
(১৯) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে প্রস্রাব পায়খানা করলে ওজু ভঙ্গ হয়, এই কথাটি সুরা বাকারার ১৫১ নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে ওজুর বিষয়টা রসুলের সাথে সম্পর্ক। তাই রসুলের মাধ্যমে কৃত দ্বীনের অঙ্গীকার ভঙ্গ করিলেই ওজু ভঙ্গ হয়। তখন সে আর মোমিন থাকে না (৪৮:১০) (৪৮:১৮)। তবে প্রস্রাব পায়খানা করলে তাহির ভঙ্গ হয়। সেক্ষেত্রে নামাজের পূর্বে ধৌত করণের মাধ্যমে তাহির হইতে বলা হয়েছে (৫:৬)।
(২০) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে আল্লাহকে না দেখে ধারণা কল্পনা ও অনুমানের মাধ্যমে স্মরণ করা। যাহা ১০নং সুরা ইউনুসের ৩৬নং আয়াত এবং ১৬নং সুরা নহলের ৭৪ নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ যারা আল্লাহকে দেখেনি তারা আল্লাহকে কল্পনা করতে গেলে তার মন মস্তিষ্কে আল্লাহর একটি কাল্পনিক রূপ তৈরি হয়। এবং আল্লাহ সম্পর্কে ঐ কাল্পনিক রূপটি আল্লাহ সম্পর্কে একটি মেসেল বা উপমা হিসাবে গণ্য হয়। কারণ আপনি আল্লাহকে যেমনটি কল্পনা করেন আল্লাহ তো তেমনটি নহে। কারণ আল্লাহ তো আল্লাহর মতো। এই জন্য আপনার মস্তিষ্কে আল্লাহ কাল্পনিক রূপটি একটি উপমা বা মেসেল হিসাবে গণ্য হচ্ছে। যাহা সুরা নহলের ৭৪নং আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর কোন মেসেল বা উপমা গ্রহণযোগ্য নয়। এই জন্য আল্লাহ বলেন সত্য সম্পর্কে ধারণা বা কল্পনা ও অনুমান মোটেও ফলপ্রসু নহে (১০:৩৬)। কাজেই রসুল সুরতে আল্লাহর দর্শন লাভ না করে যারা আল্লাহকে ধারণা কল্পনা বা অনুমানে ইবাদত-বন্দেগী করছেন যাহা (১০:৩৬) আয়াত এবং (১৬:৭৪) আয়াতের পরিপন্থী। যাহা আল্লাহ সম্পর্কে শেরেক বলা হয় (বিস্তারিত শেরেক অধ্যায়ে দেখুন)।
(২১) যেহেতু নবী (সা.) গায়েবের বিষয়ে অবগত নহেন (৬:৫০) (৭:১৮৮) একমাত্র আল্লাহই গায়েব জানেন। ২৭নং সুরা নমল ৬৫ আয়াত। সেহেতু নবী (সা.) ওহী ব্যতীত কাউকে দ্বীনের বিষয়ে তথা গায়েব বিষয়ে সতর্ক করে নাই (২১:৪৫)। অর্থাৎ দ্বীন সম্পর্কে ওহী ব্যতিত কোন কথা বলেন নাই। আর তাই তিনি নিজেও ওহী ব্যতিত কোন কিছুর অনুসরণ করে নাই। (৬:৫০)। আর যাহা ওহী তাহা কুরআন অর্থাৎ নবী (সা.) উপর নাযিলকৃত সকল ওহীই কুরআনের মধ্যে আর কুরআনের মধ্যে ওহী ব্যতিত কোন কথা নেই বিধায় এই কুরআনে কোন সন্দেহ নাই (১:১)। যেহেতু মানরাব্বুকা, মানদীনুকা, মানহাযারাজুলুন এই তিনটি প্রশ্ন করে মৃত্যুর পরে ইমান পরীক্ষা করা হবে মর্মে কোরআনে কোন আয়াত নেই বরং কুরআনে বলা হয়েছে জালিমদের জন্য যে পরীক্ষা নির্দিষ্ট মোমিনদের জন্যও একই পরীক্ষা করা হবে (৮:২৫)। সেক্ষেত্রে দেখা যায় ইবলিশের জন্য যে পরীক্ষা সকল মানুষের জন্যও একই পরীক্ষা। এখন ইবলিশের ঈমান পরীক্ষার সময় যদি তাকে প্রশ্ন করা হয় মানরাব্বুকা তোমার প্রভু কে? সে বলবে আমার প্রভু আল্লাহ। কারণ ইবলিশ লানত পাওয়ার পরও আল্লাহকেই প্রভু বলেই স্বীকার করে (১৫:৩৬)। ইবলিশকে যদি প্রশ্ন করা হয় মানদিনুকা তোমার দ্বীন কে? সে বলবে আমার দ্বীন ইসলাম। কারণ আসমান জমিনে যাহা কিছু আছে সকলেই আল্লাহতেই আত্মসমর্পণকারী (৩:৮৩)। নবী করিম (সা.)কে দেখিয়ে যদি ইবলিশকে প্রশ্ন করা হয় মানহাজারাজুলুন এই লোকটি কে? তখন ইবলিশ তো বলবে ইনি নবী মোহাম্মদ (সা.)। কারণ ইবলিশ তো মোহাম্মদ (সা.)কে দেখেছে ও চেনেন। কাজেই যদি উক্ত তিনটি প্রশ্ন করে মৃত্যুর পরে কবরে জীবিত করে ঈমান পরীক্ষা করা হয় তাহলে ইবলিশ ঈমান পরীক্ষায় পাশ করে যায় বিধায় তাকে তো জান্নাতে দেওয়া লাগে। কিন্তু ইবলিশ কখনো জান্নাতে যাবে না নিশ্চিত। সে তো জান্নাত থেকে বহিস্কৃত (১৫:৩৪)। তাই ইবলিশের ঈমান পরীক্ষা করার জন্য সেই কাজটি করতে বলা হবে যে কাজটি ইবলিশ না করেই কাফের। অর্থাৎ যে কাজটি ইবলিশ করে নাই এবং কখনও করবে না। আর সেই কাজটি হচ্ছে আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা করা। আর ইবলিশ তো আল্লাহকে সেজদা না দিয়েই কাফের (২:৩৪)। আর ইবলিশ কখনো আদমসেজদায় সামিল হবে না (১৫:৩৩)। আর ইবলিশের ঈমান পরীক্ষা করার জন্য আদমকাবায় সেজদাটা পরীক্ষা করা হবে বিধায় সেদিন আকৃতি বিশিষ্ট আল্লাহর পায়ে সেজদা দিতে বলা হবে (৬৮:৪২)। আর ইবলিশ এবং তার অনুসারিরা সেজদা দিতে সক্ষম হবে না (৬৮:৪২)। কারণ যখন তারা নিরাপদ ছিলো তখন তাদের এই সেজদার জন্য আহ্বান করা হয়েছিল তারা করে নাই (৬৮:৪৩)। তাহলে দেখা গেল মানরাব্বুকা মানদিনুকা মানহাজারাজুলুন এই তিন প্রশ্ন করে সেদিন ঈমান পরীক্ষা করা হবে না নিশ্চিত। তবে এই বিষয়টা কুরআনে নাই অথচ কিতাবীরা প্রচলিত দ্বীনের ভিতরে সত্যের বিপরীতে প্রবেশ করিয়েছে বিধায় এহেন মিথ্যা কথা বর্জন করাই উত্তম।
(২২) প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে নবী (সা.) মিরাজে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে এসেছে। এই কথাটি (১৭:১) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ মিরাজ এর উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর দর্শন লাভ। তাছাড়া কোরআনে এমন কোন আয়াত নেই যে, নবী (সা.) মিরাজে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে এসেছে। কারণ সালাতের বিষয়টা পূর্বের নবীদের জন্যেও হুকুম ছিল (২০:১৪)। নবী (সা.) মিরাজে গিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত সালাত নিয়ে এসেছে কথার কোন ভিত্তি নেই। অতএব যারা ইহলোকে প্রভুর দর্শনে বিশ্বাসী তারাই নবী (সা.)-এর অনুসারী আর যারা প্রভুর দর্শন অস্বীকারকারী তারা নবী (সা.)-এর অনুসারী নহে।
(২৩) প্রত্যেক রসুলই নবী প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩:৮১) আয়াতের পরিপন্থী কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে নবীর পরে রসুল আসবে। নবীর পরে যে রসুল আসবে সেই রসুল নিশ্চয় নবী নহে। কারণ সেই রসুল যদি নবী হতো তাহলে (৩:৮১) আয়াতে বলা হইতো নবীর পরেও নবী আসবে। কিন্তু আয়াতে বলা হয়েছে প্রত্যেক নবীর পরে রসুল আসবে। তাহলে নবীর পরে যে রসুল আসবে সেই রসুল যেহেতু নবী নহে সেহেতু প্রত্যেক নবীই রসুল কথাটি (৩:৮১)নং আয়াতের পরিপন্থী এটা নিশ্চিত। তাছাড়া প্রত্যেকই রসলই নবী কথাটি (৪:৬৯) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে রসুলের আনুগত্য করলে নবীর সঙ্গী হবে। তাহলে এই আয়াতে যে রসুলের কথা বলা হয়েছে সেই রসুল নিশ্চই নবী নহে। যদি এই আয়াতে বর্ণিত রসুল নবী হইতো তাহলে এই আয়াতে বলা হইতো নবীর আনুগত্য করলে নবীর সঙ্গী হবে। কিন্তু উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে রসুলের আনুগত্য করলে নবীর সঙ্গী হবে। এখানে উল্লেখ যে নবীর আনুগত্য কর কথা কোরআনে উল্লেখ নাই। কাজেই (৪:৬৯) আয়াতে বর্ণিত রসুল নবী নহে নিশ্চিত। প্রত্যেক রসুলই নবী কথাটি উক্ত আয়াতের পরিপন্থী।
(২৪) প্রত্েযক নবী রসুল নহে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৭২:২৩) নং আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে বলা হয়েছে প্রত্যেক নবীর উপর (নবুয়ত ওহী ও কিতাব) আল্লাহর পক্ষ থেকে পৌছানোর পরে তাকে রেসালাত দেওয়া হয়েছে। তাহলে আল্লাহর প্রেরিত প্রত্যেক নবীই রসুল।
(২৫) প্রত্যেক রসুলই ওহী প্রাপ্ত। প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২১:২৫) নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে মা আর সালনা মিন কাবলিকা মিন আর রসুলী ইল্লা ওহীয়ান। তোমার পূর্বে এমন অনেক রসুল পাঠিয়েছি যাহারা ছিল ওহী ব্যতিত (বিস্তারিত ২২নং অধ্যায় দেখুন)।
(২৬) নবী শেষ হওয়ার সাথে সাথে রসুলও শেষ প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৫:১৯) আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে বলা হয়েছে নবীর প্রেরণের বিরতির পরও রসুল প্রেরণ করিÑ যেন তারা না বলতে পারে যে আমরা সতর্ককারী (রসুল) পাইনি।
(২৭) নবী শেষ হওয়ার সাথে রসুলও শেষ প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩:৮১) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে নবীর পরপরই রসুল আসবে।
(২৮) বর্তমানে কোন রসুল নেই প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (১৭:১৫) (২৮:৫৯) (২৮:৪৭) এবং (৩:১০১) আয়াতের পরিপন্থী। উক্ত আয়াতগুলিতে রসুল না পাঠিয়ে কাউকে শাস্তি দেওয়া হবে না এমনটি বলা হয়েছে। কোরআন আবৃত্তির জন্য রসুল পাঠাবে বলা হয়েছে। রসুলের উপস্থিতিকে নিশ্চিত করেছেন। তাছাড়া (২:১৫১) আয়াতে বলা হয়েছে রসুল তোমাকে পবিত্র করবে।
(২৯) রসুলের বিকল্প হিসাবে নায়েবী রসুলগণ আছেন প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (১৭:১৫) (২৮:৫৯) (২৮:৪৭) এবং (৩:১০১) (২:১৫১) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ উক্ত আয়াতগুলিতে সরাসরি রসুলের কথা বলা হয়েছে। কোনো নায়েবী রসুলের কথা বলা হয় নাই কিংবা রসুলের বিকল্প হিসেবে ওলামাগণের কথা বলা হয় নাই। কিংবা উলিল আমরগণের কথা বলা হয় নাই, কিংবা পীরগণের কথা বলা হয় নাই বরং বলা হয়েছে যে, রসুল না পাঠিয়ে।
(৩০) ইতিপূর্বে রসুলের সংখ্যা মাত্র ৪ জন। প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪:১৬৪) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে ইতিপূর্বে আমি বহু রসুল পাঠিয়েছি। কতক রসুলের নাম কোরআনে বলা হয়েছে কতক রসুলের নাম বলা হয় নাই।
(৩১) নবী মোহাম্মদ (স:) শেষ রসুল প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩৩:৪০) (৩৩:৭) আয়াতের পরিপন্থি। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে তিনি আল্লাহর রসুল ও শেষ নবী। তিনি শেষ রসুল এমন আয়াত কোরআনে নাই।
(৩২) নবীদের মধ্যে পার্থক্য আছে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:১৩৬) নং আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে নবীদের ভিতরে কোন পার্থক্য নেই।
(৩৩) রসুলদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:২৫৩) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে রসুলদের মধ্যে পার্থক্য আছে।
(৩৪) প্রত্যেক রসুলই ওহী প্রাপ্ত প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৫:১৯) নং আয়াতের পরিপন্থী। ওহী বা নবীর বিরতীর পর অর্থাৎ দুই নবীর মধ্যবর্তী সময়ে রসুল আছে। ঐ রসুলগণের উপরে কোন ওহী ছিল না। উহারা ছিলেন ওহী ব্যতিত রসুল।
(৩৫) সরাসরি রসুলের কাছে না গিয়ে শুধু সালাত ও যাকাত আদায়ের মাধ্যমে রসুলের আনুগত্য করা যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২৪:৫৬) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে সালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর এবং রসুলেরও আনুগত্য কর।
(৩৬) রসুলের আনুগত্য মাধ্যম ছাড়াই যারা শুধু সালাত ও যাকাত আদায়ের মাধ্যমে আল্লাহর আনুগত্য করা হয় প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪:৮০) এবং (৩৩:৩৩) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ (৪:৮০) আয়াতে বলা হয়েছে রসুলের আনুগত্য করলে আল্লাহর আনুগত্য করা হয় এবং (৩৩:৩৩) আয়াতে বলা হয়েছে সালাত কায়েম কর, যাকাত আদায় কর ও আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য কর।
(৩৭) নবীর দশটি সুন্নত পালন করলেই নবীকে পাওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪:৬৯) আয়াতের পরিপন্থী। এই আয়াতে বলা হয়েছে রসুলের আনুগত্য করলেই নবীর সঙ্গী হবে।
(৩৮) আল্লাহ ও রসুলরে আনুগত্য ছাড়াই শুধু সালাত আদায়ের মাধ্যমে জান্নাতে যাওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪৮:১৭) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করতে তারা জান্নাতে যাবে।
(৩৯) আল্লাহর দয়া ছাড়া বিভিন্নভাবে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে নেকী সংগ্রহ করে নেকীর পাল্লা ভারী করে আমলনামা ডান হাতে নিয়ে জান্নাতে গিয়ে জাহান্নামের মহাশাস্তি থেকে রেহাই পাওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২৪:১৪) (২৪:১০) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর দয়া ছাড়া মহাশাস্তি থেকে কেউ রেহাই পাবে না।
(৪০) আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য ছাড়া বিভিন্নভাবে ইবাদত বন্দেগীর মাধ্যমে আল্লাহর দয়া পাওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩:১৩২) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতের বলা হয়েছে যিনি আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করতে আল্লাহ তাকে দয়া করবে।
(৪১) আদমকাবায় সেজদা না দিয়ে নবীর অনুসারী হওয়া যায় প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (১৫: ২৯) (৩৮:৭২) (৭:১১) (২:৩৪) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ ইবলিশ আদমকাবায় সেজদা দেয় নাই। আর ইবলিশ আদমকাবায় আল্লাহকে সেজদা না দিয়েই কাফের।
(৪২) আর নবীর অনুসারী না হয়ে বিভিন্নভাবে নেক আমল করে পাপ ক্ষমা পাওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩:৩১) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা নবীর অনুসারী হবে কেবল তারাই পাপ থেকে মুক্ত হবেন।
(৪৩) সম্যক গুরু তথা রসুলের আনুগত্য না করে নবীর অনুসারী হওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪:৬৯) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করতে তারাই নবীর সঙ্গী হবে।
(৪৪) জন্মসূত্রে প্রত্যেক বণি আদমই আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২৪:৫৫) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা ইমান আনবে এবং সৎকর্ম করবে তাদের মধ্য থেকে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তাকে প্রতিনিধিত্ব দান করবে।
(৪৫) ইমান ও সৎকর্ম করলে দ্বীন প্রচার করা যাবে রেসালাতের ভার প্রাপ্ত না হয়ে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৬:২৪) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা করেন তাকে আল্লাহ রেসালাতের ভার অর্পন করেন।
(৪৬) ইমান অর্জন ও সৎকর্ম না করে শুধু সালাত আদায় করলেই পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:২৭৭) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আগে ইমান ও সৎকর্ম পরে সালাত ও যাকাত আদায় করার কথা।
(৪৭) ইমান অর্জন না করে ও সৎকর্ম না করে আল্লাহর আনুগত্য ও রসুলের আনুগত্য না করে। শুধু পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করলে বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়লেই আল্লাহ পাঁচটি পুরস্কার দিয়ে জান্নাতে দিবে। প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি পবিত্র কোরআনের (১০৩:২) (১০৩:৩) (৪৮:১৭) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে ইমান ও সৎকর্ম ব্যতিত সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্থ হবে এখানে উল্লেখ্য যে, (১০৩:২) আয়াতে কিন্তু সালাত কায়েম না করলে ক্ষতিগ্রস্থ হবে এমন কথা বলা হয় নাই এবং যারা আল্লাহ ও রসুলের আনুগত্য করবে উহারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে (৪৮:১৭)।
(৪৮) আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন না করে এবং আল্লাহকে ভয় না করে শুধুমাত্র কাবাগৃহের পশ্চাৎ দিক থেকে দ্বার দিয়ে ক্বাবা গৃহের ভিতরে প্রবেশ করলেই পূণ্য লাভ হবে এবং সকলকাম হওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:১৮৯) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে পশ্চাৎ দিক দিয়ে (হজ্বের বা উমরার ইহরাম বাধিয়া ক্বাবা) গৃহে প্রবেশ করাতে কোন পূর্ণ নাই কিন্তু পূণ্য আছে কেহ তাকওয়া অবলম্বন করিলে। সুতরাং তোমরা (হজ্বের বা উমরার সময় ইহরাম বাঁধিয়া (টিকা নং-১৩২) ক্বাবা) গৃহের দ্বার দিয়া প্রবেশ কর। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর যাহোতে তোমরা সফল কাম হতে পার।
(৪৯) কাফিররা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে আক্রমণ না করিলেও তোমরা কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধের আক্রমণ করিবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:১৯০) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকরে তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ কর। কিন্তু সীমা লঙ্ঘন করিও না। নিশ্চয় আল্লাহ সীমা লঙ্ঘন কারীগণকে ভালোবাসেন না।
(৫০) যদি কেহ তোমাকে আক্রমণ নাও করে তোমরা দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য তাকে আক্রমণ কর প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (২:১৯৪) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে, যে কেহ তোমাদিগকে যেরূপ আক্রমণ করিবে তোমরাও তাকে অনুরূপ আক্রমণ করিবে। কাজেই যদি কাফিররা বা অন্য কেহ যদি তোমাদেরকে আগে আক্রমণ না করে তাহলে তোমরা তাদের দ্বীনের ক্ষেত্রে আক্রমণ করিতে পারিবে না। যদি কেহ এমন করে তাহলে সেটা উক্ত আয়াতের পরিপন্থী হবে।
(৫১) সৃষ্টির সাথে স্রষ্টা তথা আল্লাহ নেই প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪:১২৬) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহ সকল কিছুর সাথে মহিতুন হয়ে আছে। (বি. দ্র. মানুষের মধ্যে আল্লাহর অবস্থান বিস্তারিত দেখুন)
(৫২) আল্লাহর সাথে রসুলের নাম ডাকা যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৭২:১৮) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে। তোমরা আল্লাহর সাথে কাউকে ডেকো না।
(৫৩) আবার রসুলের আনুগত্য না করে সরাসরি আল্লাহকে প্রভু বলে মোমিন হওয়া যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩৩:৩৩) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে রসুলের আনুগত্য করতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ রসুলকে বাদ দিলে ইবলিশের অনুসারী কাফের। কারণ ইবলিশ তো আল্লাহকে প্রভু বলে (১৫:৩৬)। তারপরও সে রসুলের আনুগত্যের সেজদা না দিয়ে কাফের (২:৩৪)। রসুলকে বাদ দিয়ে সরাসরি আল্লাহকে প্রভু বলে নিজেকে মোমিন দাবি করা উক্ত আয়াতের পরিপন্থী। (বিস্তারিত একত্ববাদের দ্বীন অধ্যায় দেখুন)।
(৫৪) আল্লাহকে বাদ দিয়ে রসুলকে ডাকা যাবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (১০:১০৬) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে তোমরা আল্লাহকে বাদে কাউকে ডেকো না।
(৫৫) নিজে ইচ্ছা করলেই মোমিন হওয়া যাবে। প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (১০:১০০) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর অনুমতি ব্যতিত ইমান অর্জন করা কাহারো সাধ্য নাই।
(৫৬) মোমিন না হয়ে অর্থাৎ ইবলিশের অনুসারী হয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাহিলে আল্লাহ তোমাকে সাহায্য করিবে প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৪৭:৭) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে হে মোমিনগণ যদি তোমরা আল্লাহকে সাহায্য কর আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করিবে।
(৫৭) যেহেতু (৪:১৫১) আয়াতে বলা হয়েছে রসুল থেকে আল্লাহকে ঝবঢ়ধৎবধঃ করা যাবে না বা পৃথক করা যাবে না। সেক্ষেত্রে (৪৮:১০) আয়াত অনুসারে রসুলের হাত আল্লাহর হাত বিশ্বাস করতে গিয়ে যেহেতু নবী (সা.) বর্তমানে উপস্থিত নাই তাঁর ঠিকানা হিসাবে তার মাজার বর্তমান আছে। সেক্ষেত্রে নবী (সা.)-এর মাজারে হাত রেখে এই মাজার আল্লাহর মাজার বলার বিষয়টা (২:২৫৫) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর কোন মৃত্যু নাই। সেহেতু প্রচলিত দ্বীনের বিধান মতে নবী মোহাম্মদ (সা.)কে বর্তমান মানুষের জন্য রসুল হিসেবে বিশ্বাস করাটা (৪:১৫০) (৪৮:১০) আয়াতের প্রয়োগের ক্ষেত্রে পরিপন্থী।
(৫৮) মানুষের মৃত্যু একবার প্রচলিত দ্বীনের এই বিষয়টা (২:২৮) আয়াত এবং (৪০:১১) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ উক্ত আয়াতে বলা হয়েছে তোমাকে দুইবার মৃত্যু দেওয়া হয়েছে এবং দুইবার জীবিত করা হয়েছে।
(৫৯) ইসলামে কোন জন্মান্তরবাদ নেই প্রচলিত দ্বীনের দ্বীনের বিধান অনুসারে তো (৩৯:৬৮) আয়াতের সাথে (৪০:১১) (২:২৮) আয়াতে বর্ণিত দুইবার মৃত্যু কথাটির সাথে পরস্পর বিরোধ হয়। কারণ (৩৯:৬৮) আয়াতে বলা হয়েছে কিয়ামতের দিন একবার মৃত্যুর কথা বলা হয়েছে। (বিস্তারিত জন্মান্তরবাদ অধ্যায় দেখুন অথবা এই পুস্তুকের ২য় অধ্যায় দেখুন)।
(৬০) আল্লাহকে চেনার জন্য কোন শায়ের বা স্মৃতি চিহ্ন নেই প্রচলি দ্বীনের এই কথাটি (২২:৩২) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আল্লাহর শায়ের বা স্মৃতি চিহ্ন আছে।
(৬১) মুসা (আ.) আল্লাহর সাক্ষাৎ লাভ করেনি প্রচলিত দ্বীনের এই কথাটি (৩২:২৩) আয়াতের পরিপন্থী। কারণ এই আয়াতে বলা হয়েছে আমি মুসাকে কিতাব দিয়েছি তোমরা মুসার সাথে আমার সাক্ষাতের বিষয়টা সন্দেহ করিও না। (বিস্তারিত মুসার সাথে আল্লাহর দর্শন অধ্যায় দেখুন)। অতএব যে সমস্ত বিষয়গুলি কুরআনের মধ্যে নাই এবং কুরআনের পরিপন্থী প্রচলিত দ্বীনের সেই বিষয়গুলি ইতিপূর্বে কিতাবীগণ সুরা মায়েদার ৭৭নং আয়াত অমান্য করে দ্বীনের মধ্যে সুরা বাকারার ৭৯নং আয়াত মতে দেখা যায় কিতাবীরা নিজ হাতে লিখে (৩:৭১) আয়াত অমান্য করে সত্য কোরআনের সাথে মিথ্যা মিশ্রিত করেছে যা, যাহা বর্জনীয়। এইগুলি যারা বর্জন না করিয়া দ্বীনের ভিতরে রাখিয়া মানিয়া চলিবে সেইদিন তার নিজেদের দ্বীনের মধ্যে মিথ্যা উদ্ভাবন তাহাদিগকে প্রবঞ্চিত করিবে (৩:২৪)।

পবিত্র কোরআন থেকে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা
(২য় খন্ড)